হিন্দুপাড়ায় একের পর এক অগ্নিসংযোগ, প্রশাসনের নীরবতা ঘিরে উদ্বেগ ও ক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৫
284 জন পড়েছেন
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত একটি পল্লীতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সাতটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা। সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, এই অগ্নিকাণ্ডগুলো একটি নির্দিষ্ট মহলের নাশকতার অংশ।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য, যাতে তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অগ্নিসংযোগের প্রথম ঘটনাগুলোর পর থানা পুলিশ এলাকা পরিদর্শন করলেও পরবর্তী দিনগুলোতে আগুন দেওয়ার ঘটনা বন্ধ হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্যেও কার্যকর কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি, তাই তদন্ত প্রক্রিয়া এগোতে সময় লাগছে। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেছেন। তবে বাস্তবে এসব বক্তব্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আশার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনায় প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে—এমন মত দিচ্ছেন সচেতন মহল। অতীত অভিজ্ঞতাও এই আশঙ্কাকে শক্তিশালী করে। গত বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ১২টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ঘটনায় ঘরের ভেতরে মানুষ আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন দেওয়ার মতো নৃশংসতার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনার একটিরও আজ পর্যন্ত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা বেড়েছে। এ বিষয়ে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও শুরুতে সরকার এসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে স্বীকার করতে অনীহা দেখায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়লে কিছু ঘটনা মেনে নেওয়া হলেও এখনো অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতন বাংলাদেশে নতুন নয়; দশকের পর দশক ধরে এটি চলে আসছে। তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান সরকার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে না।
নিরাপত্তাহীনতার কারণে যদি সংখ্যালঘু নাগরিকরা ভোটকেন্দ্রে যেতে না পারেন, তবে শুধু নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের নয়, সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা সংখ্যালঘুদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে যেই দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকারে রাখা জরুরি—এমনটাই প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।