আজও রেস্তোরাঁয় প্রবেশের অধিকার নেই দেশের অনেক স্হানের হিন্দু হরিজন ধর্মাবলম্বীদের
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৮ জুন ২০২৬, ১৪:৪৮
159 জন পড়েছেন
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন দেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছে, তখন সমাজের এক বড় অংশ এখনও চরম অবহেলা ও অস্পৃশ্যতার শিকার। ‘হরিজন’ বা পরিচ্ছন্নতা কর্মী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো আজও অনেক এলাকায় সাধারণ রেস্তোরাঁ বা হোটেলে বসে খাবার খাওয়ার অধিকার পান না। সভ্য সমাজের এই বৈষম্যমূলক চিত্রটি আমাদের মানবিক বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কিছু স্থানে সরজমিনে দেখা গেছে, হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন কোনো হোটেলে গেলে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য হোটেলের বাইরে আলাদা ভাঙা বাসন বা প্লাস্টিকের ওয়ান-টাইম প্লেট বরাদ্দ থাকে। এমনকি খাবার শেষে তাদের ব্যবহৃত স্থানটি জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে ফেলার মতো অপমানজনক ঘটনাও ঘটে।
এই সম্প্রদায়ের একজন সদস্য বিষণ্ণ মনে বলেন, "আমরা শহর পরিষ্কার রাখি, মানুষের ময়লা টানি। কিন্তু আমাদের হাতে কেউ এক গ্লাস পানিও খেতে চায় না। হোটেলে গেলে আমাদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যেন আমরা মানুষ নই, অন্য কোনো জগতের প্রাণী।"
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" ২৮ (৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের বিনোদন বা বিশ্রামের কোনো স্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। হরিজনদের সাথে এই আচরণ সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন। তা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও হোটেল মালিকদের একগুঁয়েমির কারণে এই প্রথা আজও টিকে আছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শত বছরের লালিত জাত-পাত এবং পেশাভিত্তিক কুসংস্কার থেকেই এই অস্পৃশ্যতার জন্ম। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যেহেতু ময়লা-আবর্জনা নিয়ে কাজ করেন, তাই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অমূলক ভীতি বা ঘৃণা কাজ করে। অথচ তারা এই কাজ না করলে শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ত।
এই বৈষম্য দূর করতে শুধু আইন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
প্রশাসনের ভূমিকা: হোটেল বা রেস্তোরাঁগুলোতে যাতে কোনো প্রকার বর্ণবৈষম্য না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের মাধ্যমে অস্পৃশ্যতাবিরোধী প্রচারণা চালানো।
আইনি পদক্ষেপ: বৈষম্যবিরোধী বিল বা আইন দ্রুত কার্যকর করা এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা।
যে মানুষগুলো আমাদের শহরকে বাসযোগ্য রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করে, তাদের সম্মান দেওয়া আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। পেশার ভিত্তিতে মানুষের পরিচয় হওয়া উচিত নয়, বরং মানুষ হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আধুনিক সমাজের লক্ষ্য।