এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষার মাত্র ১৪ দিন আগে হারিয়েছিলেন বাবাকে। মাথার ওপর থেকে সরে গিয়েছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনের ছায়া। সামনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, আর পরিবারে নেমে এসেছিল গভীর অনিশ্চয়তা। কিন্তু শোক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা কোনো কিছুই থামাতে পারেনি সজীব চন্দ্র সরকারের পথচলা। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে করেছেন টিউশনি, পাশাপাশি সামলেছেন পারিবারিক দায়িত্ব। দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও গবেষণার পথ পেরিয়ে সেই সজীব এবার যুক্তরাষ্ট্রে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার এক কৃষক পরিবারে জন্ম সজীব চন্দ্র সরকারের। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু কৈশোরেই সেই স্বপ্নের পথে আসে বড় ধাক্কা। ২০১৬ সালে এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষার মাত্র ১৪ দিন আগে বাবাকে হারান সজীব। জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাবার মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একদিকে প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক, অন্যদিকে সামনে পরীক্ষা—সবকিছু সামলে তাকে এগিয়ে যেতে হয়েছে নিজের শক্তিতে।
তবে এই কঠিন সময়ে একা ছিলেন না সজীব। তার পাশে ছিলেন মা, দাদা ও দিদি। নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা সজীবের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে সমর্থন করেছেন। ময়মনসিংহের বন্ধুদের কাছ থেকেও পেয়েছেন সহযোগিতা ও উৎসাহ। পরবর্তী সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকেও পেয়েছেন নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
সজীব ২০১৫ সালে নেত্রকোনার নোয়াপাড়া হাই স্কুল, কেন্দুয়া থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে ময়মনসিংহের আলমগীর মনসুর (মিন্টো) মেমোরিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮ সালে ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান (Botany) বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও তার সংগ্রামের অবসান হয়নি। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতে নিয়মিত টিউশনি করেছেন তিনি। পড়াশোনা, টিউশনি এবং পারিবারিক দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাও তার এই কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন সজীব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। MSc thesis করার সুযোগ পান বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) Genomic Lab-এ। সেখানে গবেষণাকাজের সময় Scientific Officers, labmates এবং বন্ধুদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, সহযোগিতা ও উৎসাহ পেয়েছেন তিনি।
গবেষণার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে সজীবের মধ্যে তৈরি হয় বাস্তব গবেষণার অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্নও আরও দৃঢ় হয়। MSc শেষ করার পর ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়—বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভিসা প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ অপেক্ষা।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের East Tennessee State University (ETSU)-তে Biomedical Sciences বিষয়ে ফুল-ফান্ডেড PhD করার সুযোগ পেয়েছেন সজীব চন্দ্র সরকার। সেখানে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন তিনি।
একজন কৃষকের ঘর থেকে উঠে আসা তরুণ, যিনি একসময় নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন, যিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই হারিয়েছেন বাবাকে—সেই সজীবই আজ বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন। তার এই অর্জন তাই শুধু একটি শিক্ষাগত সাফল্য নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল।
এই সাফল্যের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে প্রয়াত বাবা এবং প্রিয় কাকা লিটন চক্রবর্তীর কথা। দুজনই এখন পৃথিবীতে নেই। সজীবের বিশ্বাস, তারা আজ বেঁচে থাকলে তার এই অর্জনে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন। হয়তো গর্ব করে বলতেন, ‘তুই পেরেছিস।’
তবে নিজের এই সাফল্যকে কখনোই একার অর্জন হিসেবে দেখছেন না সজীব। তার মতে, এই পথচলার পেছনে রয়েছে মা, দাদা-দিদি, ময়মনসিংহের বন্ধু, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠী, শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক, BCSIR-এর Scientific Officers, labmates, mentor এবং বিভিন্ন সময়ে পাশে থাকা অসংখ্য মানুষের অবদান।
সজীব চন্দ্র সরকারের গল্প তাই কেবল বিদেশে পিএইচডি পাওয়ার গল্প নয়। এটি শোক, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। তার জীবনপথ দেখিয়ে দেয়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, চেষ্টা ও অধ্যবসায় ধরে রাখলে স্বপ্নের দরজা একসময় খুলে যেতে পারে।
নেত্রকোনার এক কৃষক পরিবারের ঘর থেকে শুরু হওয়া সজীবের পথচলা এবার হাজারো মাইল পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে। নতুন পরিচয়ে তিনি এখন Biomedical Sciences-এর PhD Student, East Tennessee State University, USA।
বাবাকে হারানোর শোক থেকে স্বপ্নজয়ের এই যাত্রা শুধু সজীবের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা অসংখ্য শিক্ষার্থীর জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।