এসএসসি পরীক্ষার্থী শর্মি দাসের শিক্ষাজীবনে বিপর্যয়: দায়িত্বহীনতা, বিভ্রান্তি নাকি ব্যবস্থাগত ত্রুটি?
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪০
170 জন পড়েছেন
“পরীক্ষা দিয়ে এসে আমার মেয়ে বলছে, সে আর বাঁচতে চায় না”—কাঁপা কণ্ঠে এমনটাই বলছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী শর্মি দাসের বাবা শ্যামল চন্দ্র দাস। একটি প্রশাসনিক জটিলতা, ভুল বোঝাবুঝি এবং দায়িত্বহীনতার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
চট্টগ্রামের বিসিএসআইআর স্কুলের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী শর্মি দাস পরীক্ষার হলে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি ‘নিয়মিত’ নয়, বরং ‘অনিয়মিত’ পরীক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। ফলে তাকে ২০২৫ সালের পুরোনো সিলেবাস অনুযায়ী প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়, যদিও তিনি পুরো সময় প্রস্তুতি নিয়েছেন ২০২৬ সালের নতুন সিলেবাসে।
পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে বিস্মিত হয়ে পড়েন শর্মি। তার ভাষায়, “আমি ম্যাডামকে বলি আমি তো নতুন সিলেবাসে পড়েছি। কিন্তু তারা বলেন, প্রবেশপত্রে ২০২৫ লেখা, কিছু করার নেই।” এই পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। শর্মি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে ২০২৩ সালে নবম শ্রেণিতে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেননি। পরবর্তীতে পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, তিনি আবার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হবেন। কিন্তু নতুন করে ভর্তি হলেও তার পূর্বের রেজিস্ট্রেশন বাতিল বা সংশোধন করা হয়নি—যা পরবর্তীতে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিবারের দাবি, স্কুল কর্তৃপক্ষ কখনো তাদের জানায়নি যে শর্মি ‘অনিয়মিত’ শিক্ষার্থী হিসেবে গণ্য হবেন কিংবা তার জন্য আলাদা সিলেবাস প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে স্কুলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থী নিজে বিষয়টি জানায়নি।
ঘটনাকে আরও জটিল করে তোলে রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংক্রান্ত অব্যবস্থাপনা। শর্মি পরীক্ষার আগে তার রেজিস্ট্রেশন কার্ড পাননি। বহুবার চেষ্টা করেও স্কুল থেকে তা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন। এমনকি তাকে বলা হয়, তার রেজিস্ট্রেশন কার্ড নাকি বাসায় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি জেএসসি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও এসএসসি প্রবেশপত্র নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন।
পরীক্ষা শেষে তার বাবা স্কুলে গিয়ে খোঁজ নিলে অফিস থেকেই রেজিস্ট্রেশন কার্ড বের করে দেওয়া হয়—যা আগে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবক।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাফর উল্লাহ দাবি করেছেন, শর্মি নিজেই রেজিস্ট্রেশন কার্ড সংগ্রহ করেননি। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার ঘটনাটিকে ‘চরম দায়িত্বহীনতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, এ ধরনের অভিযোগ একাধিক এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পরীক্ষা শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সিলেবাস পরিবর্তন নিয়ে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। পুরোনো রেজিস্ট্রেশনধারী শিক্ষার্থীদের পুরোনো সিলেবাসে এবং নতুনদের নতুন সিলেবাসে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো হয়। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেনি।
বর্তমানে শর্মি দাস চরম মানসিক চাপে রয়েছেন। পরিবার আশঙ্কা করছে, এই ভুলের মাশুল তাকে পুরো শিক্ষাজীবন জুড়ে বহন করতে হতে পারে।
এই ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা, তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি এবং দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। একটি প্রশাসনিক ভুল কিংবা অবহেলা কীভাবে একটি শিক্ষার্থীর জীবনকে সংকটে ফেলে দিতে পারে—শর্মির ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ।