শৈশব কি খেলার মাঠ ছেড়ে মুঠোফোনে বন্দী?
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
০৫ জুন ২০২৬, ১২:০৫
182 জন পড়েছেন
বাংলাদেশে শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। খেলার মাঠের অভাব, অতিরিক্ত শিক্ষার চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ এখন মুঠোফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক সেমিনারে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, দেশের ১০ হাজার ৭৪০টি বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৮৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে খেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয় বহুতল ভবনের সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা ও শারীরিক চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শুধু মাঠের অভাবই নয়, শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রুটিনও খেলাধুলার অন্যতম প্রতিবন্ধক। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন কিংবা বাড়ির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে অবসর সময় বলতে তাদের জীবনে খুব সামান্যই কিছু অবশিষ্ট থাকে। অনেক অভিভাবকও শিশুদের অধিক সময় পড়াশোনায় ব্যয় করতে উৎসাহিত করেন, যার ফলে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড গুরুত্ব হারাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলা শিশুর শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসিক বিকাশ, নেতৃত্বের গুণাবলি, সামাজিক যোগাযোগ এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় শিশুরা ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। এর ফলে চোখের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, আচরণগত পরিবর্তন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
একসময় বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের কার্যক্রম শুরু হতো পিটি-প্যারেড ও সকালের সমাবেশের মাধ্যমে। বর্তমানে মাঠের অভাবে অনেক বিদ্যালয়ে এসব কার্যক্রম আর পরিচালিত হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা শারীরিক অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে খেলার মাঠ বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত খেলার পিরিয়ড চালু করা এবং বিদ্যালয়ের মাঠ শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি এলাকায় উন্মুক্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে সৃজনশীল কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং গ্রন্থাগারভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বইপড়া, বিজ্ঞান প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন তাদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
শিশুরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সুস্থ, আনন্দময় ও সৃজনশীল শৈশব নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। খেলার মাঠ হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই আগামী প্রজন্মের স্বার্থে এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও সচেতন উদ্যোগ।