এই গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুইশত বছর আগে, ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দের এক পুণ্যময় পূর্ণিমা তিথিতে। তৎকালীন সাভার থানার দারোগা বাবু হরদয়াল নাথ শেষ প্রহরে নৌকাযোগে ঐতিহ্যবাহী বংশী নদী পার হচ্ছিলেন। নদী তখন শান্ত, চারিদিকে চাঁদের আলো। ঠিক সেই মুহূর্তে মাঝিরা নদীর বুকে অলৌকিক এক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তারা দেখতে পান নদীর জলে ভেসে চলেছে সাদা কাপড়ে মোড়ানো এক বৃহৎ ও রহস্যময় বস্তু। কৌতূহলবশত কাপড়টি উন্মোচন করতেই উপস্থিত সকলের চোখ বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে যায়। সেখানে শোভা পাচ্ছিল কষ্টিপাথরের নির্মিত এক অপূর্ব ও চিম্ময় চতুর্ভুজ শ্রীবিষ্ণু মূর্তি। গভীর রাতে বংশী নদীর বুক থেকে এই অলৌকিক বিগ্রহ প্রাপ্তির খবর পরদিন সকালেই বিদ্যুৎবেগে পুরো সাভার অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং আপামর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে এই অলৌকিক সংবাদ তৎকালীন মানিকগঞ্জের বালিয়াটির বিখ্যাত জমিদার পরিবারে পৌঁছায়। বালিয়াটির জমিদার হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরীর পূণ্যাত্মা মাতা বিগ্রহটির অলৌকিক রূপ ও মহিমায় মুগ্ধ হয়ে সেটিকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির পারিবারিক দেবালয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু স্বয়ং ভগবান তো নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার জন্য আসেননি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জমিদার মাতাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঘোষণা করেন যে, তিনি কানাইলাল এবং তিনি জমিদারের ভক্তিতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তবে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য তাঁর আগমন ঘটেনি। স্বপ্নাদেশে ভগবান নির্দেশ দেন, যেন তাঁর পুত্র জমিদার হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরীকে বলে সাভারের কাতলাপুর গ্রামে—যেখানে তিনি নদী থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন—সেখানে একটি সুউচ্চ ও সুন্দর মন্দির নির্মাণ করা হয়।
ভগবানের এই অলৌকিক স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর জমিদার পরিবার বিন্দুমাত্র বিলম্ব করেনি। মহারাজ কানাইলালের চিম্ময় ইচ্ছাকে শিরোধার্য করে জমিদার হরেন্দ্র বাবু সাভারের কাতলাপুরে এক সুবৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন মন্দির নির্মাণ করেন। এরপর ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ভারত থেকে পরম শাস্ত্রজ্ঞ ও নিষ্ঠাবান সনাতন ব্রাহ্মণ এনে অত্যন্ত ধুমধাম ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শ্রীশ্রী কানাইলাল জিউ বিগ্রহটি এই মন্দিরে পরম শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সাথে বিগ্রহের নিত্য সেবাপূজা, উৎসব এবং মন্দির পরিচালনার ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য জমিদার পরিবারের পক্ষ থেকে ৫ একর নিষ্কর সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে দান করা হয়।
কালের আবর্তে এবং ঐতিহাসিক নানা পটপরিবর্তনের কারণে বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি বেশ কিছু প্রতিকূলতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে। সনাতনীদের জমি ও মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা যখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মানবাধিকার রক্ষায় ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে সর্বসাধারণ ভক্তদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মন্দিরের নিত্য সেবাপূজা, সংরক্ষণ ও সার্বিক উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয় আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর ওপর। ইসকন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রের আমূল পরিবর্তন শুরু হয়।
বর্তমানে প্রায় ৫০ জন ত্যাগী ব্রহ্মচারী ভক্তের নিরলস আধ্যাত্মিক সেবা এবং সাভার ইসকনের সুযোগ্য পরিচালনা কমিটির অক্লান্ত পরিশ্রমে এই পবিত্র ধামটি এক নতুন রূপ ধারণ করছে। প্রাচীন এই পুণ্যভূমিতে বর্তমানে একটি সুবৃহৎ ও আধুনিক মডেল মন্দির প্রকল্প নির্মাণাধীন রয়েছে, যা আগামী দিনে বাংলাদেশের সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রতি বছর এখানে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে রথযাত্রা, শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী, ঝুলনযাত্রাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয়, যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। বংশী নদীর তীরে অবস্থিত সাভারের এই গৌরবময় কানাইলাল জিউ বিগ্রহ মন্দির কেবল সনাতন ধর্মের এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শনই নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির শান্তি, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক পরম আলোকবর্তিকা।