চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী কালীমন্দির: ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও পুনর্জাগরণের এক জীবন্ত স্মারক
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২৯ জুন ২০২৬, ১২:৪২
132 জন পড়েছেন
চট্টগ্রাম প্রাচ্যের বন্দরনগরী, পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের অপূর্ব মিলনে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক জনপদ। এই নগরীর বুকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন—চট্টেশ্বরী কালীমন্দির। নগরীর চট্টেশ্বরী সড়কে তিন পাহাড়ের কোণে অবস্থিত এই মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নির্মম স্মৃতির এক নীরব সাক্ষী।
চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরের প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মন্দির-সংরক্ষিত ইতিহাস ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে এর বয়স প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আর্য ঋষি, যোগী ও সাধু-সন্ন্যাসীদের তপস্যা ও সাধনার মাধ্যমে এই স্থানে দেবী চট্টেশ্বরীর প্রকাশ ঘটে। "চট্টেশ্বরী" অর্থ চট্টলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী আদ্যাশক্তি মহাকালীর রূপে যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামবাসীর কল্যাণ ও রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে বিরাজমান।
প্রথম যুগের চট্টেশ্বরী কালীমূর্তিকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, খ্রিষাণগীর নামে এক মহারাজ দক্ষিণাকালীর একটি নিমকাঠের বিগ্রহ নির্মাণ করেন। অত্যন্ত দক্ষ কারুকাজে নির্মিত সেই বিগ্রহ বহু শতাব্দী ধরে ভক্তদের আরাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিশ্বাস করা হতো, আন্তরিক ভক্তিভরে পূজা করলে দেবী চট্টেশ্বরী ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন এবং জাগতিক ও পারমার্থিক কল্যাণ দান করেন।
পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সরোয়াতলী গ্রামের সাধক রামসুন্দর দেবশর্মণ দীর্ঘদিন মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নিষ্ঠা, সাধনা ও নিয়মিত পূজার মাধ্যমে চট্টেশ্বরী মন্দির ধীরে ধীরে সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়।
মন্দিরের স্থাপত্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মূল প্রবেশপথ অতিক্রম করলে একটি উঁচু পাকা চত্বরে পৌঁছানো যায়। চত্বরের বাঁ পাশে অবস্থিত কালীমন্দির এবং ডান পাশে শিবমন্দির। শিব এখানে ভৈরবরূপে অধিষ্ঠিত, যা শাক্ত উপাসনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতীক। শিবমন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন কুণ্ড, যা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পূজার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
কিন্তু এই প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর নেমে আসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মন্দির, আশ্রম ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনের মতো চট্টেশ্বরী কালীমন্দিরেও আক্রমণ চালায়। মন্দির প্রাঙ্গণে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়, সেবায়েতের বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং বহু মূল্যবান ধর্মীয় সামগ্রী নষ্ট করা হয়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল শতাব্দীপ্রাচীন নিমকাঠের কালীমূর্তিটির ধ্বংস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে দেবীর সেই প্রাচীন বিগ্রহ ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড করে দেয়। যে বিগ্রহ শত শত বছর ধরে অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যে তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর ভক্ত ও মন্দির কর্তৃপক্ষ ভগ্নাংশগুলোর যতটুকু উদ্ধার করতে সক্ষম হন, তা সংরক্ষণ করে রাখা হয়। আজও সেই খণ্ডিত অংশ মন্দিরে সংরক্ষিত আছে, যা মুক্তিযুদ্ধের নির্মম বর্বরতার এক নীরব সাক্ষ্য বহন করে।
স্বাধীনতার পর শুরু হয় পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়। মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. তারাপদ অধিকারী। তাঁর উদ্যোগে এবং তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী তরুণ কান্তি ঘোষসহ অসংখ্য সনাতন ধর্মাবলম্বীর আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতায় মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হয়। সেই সময় প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি এবং শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি।
বর্তমানে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কষ্টিপাথরের চট্টেশ্বরী কালীমূর্তির মুখমণ্ডলে শান্তি, মমতা ও করুণার অপূর্ব প্রকাশ দেখা যায়। দেবীর শ্রীচরণতলে শায়িত শ্বেতপাথরের শিবমূর্তি শাক্ত দর্শনের গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এখানে নিত্যপূজা, আরতি ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হয়। কালীপূজা, দীপান্বিতা অমাবস্যা, দুর্গাপূজা এবং অন্যান্য উৎসবে হাজার হাজার ভক্তের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।
আজকের চট্টেশ্বরী কালীমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং মানুষের অবিচল বিশ্বাসের প্রতীক। ১৯৭১ সালে প্রাচীন নিমকাঠের বিগ্রহ ধ্বংস হয়ে গেলেও ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী চট্টেশ্বরীর আরাধনা ও মহিমা কখনো ধ্বংস হয়নি। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির আজও অতীতের গৌরব, ত্যাগ, সংগ্রাম এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সমান মর্যাদায় ধারণ করে চলেছে।
চট্টেশ্বরী কালীমন্দির তাই কেবল চট্টগ্রামের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ যেখানে ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি একই সূত্রে গাঁথা হয়ে আজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।