‘লাভ জিহাদ’ বিতর্ক: অপরাধ, আবেগ ও বিভাজনের রাজনীতি
লেখক:সুজিত ঘোষ
লেখক, কলামিষ্ট, কবি ও সংগঠক
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০১
275 জন পড়েছেন
সাম্প্রতিক সময়ে ‘লাভ জিহাদ’ শব্দটি বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সমাজে এক ধরনের আতঙ্ক ও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং জনআলোচনায় শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে যেন এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগঠিত অপরাধ। অথচ বাস্তবতা হলো—‘লাভ জিহাদ’ নামে কোনো অপরাধ রাষ্ট্রের দণ্ডবিধি বা সংবিধানে স্বীকৃত নয়। তবু একে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ, ভয় ও সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
বাস্তব ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগে যে ঘটনাগুলো সামনে আসে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা ধর্ম নয়; বরং প্রতারণা, আবেগের অপব্যবহার, জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক অসচেতনতা।
বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আবেগনির্ভর সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রবণতা বেশি। সম্পর্কের শুরুতে পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ জীবন পরিকল্পনা কিংবা বিয়ে-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় পরে সংকট তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া নাম, আংশিক পরিচয় বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়—যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসভঙ্গ ও অভিযোগে রূপ নেয়।
ধর্ম বনাম অপরাধ—ভুল জায়গায় আঙুল
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত অপরাধকে একটি সামগ্রিক ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যায় এবং পুরো একটি সম্প্রদায় সন্দেহের মুখে পড়ে। সমাজে বিভাজন গভীর হয়, নষ্ট হয় পারস্পরিক বিশ্বাস।
অথচ আইন স্পষ্ট—
•জোরপূর্বক ধর্মান্তর শাস্তিযোগ্য অপরাধ
•প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা দণ্ডনীয়
•প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের সম্মতিতে আন্তঃধর্মীয় বিয়ে সম্পূর্ণ আইনসম্মত
অতএব, অপরাধ হলে সেটি ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, ব্যক্তির কর্মের ভিত্তিতেই বিচার হওয়া উচিত।
সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের প্রশ্ন
এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও কম নয়। অনেক পরিবারে এখনও সম্পর্ক ও আবেগ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা নিষিদ্ধের মতো। ফলে সংকটে পড়েও ছেলে-মেয়েরা পরিবারকে জানাতে ভয় পায়। এই নীরবতাই অনেক সময় প্রতারণাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্পর্কের নৈতিকতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা, আইনি অধিকার ও সম্মতির গুরুত্ব নিয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা জরুরি। কেবল সতর্কবার্তা নয়, প্রয়োজন সচেতন সংলাপ।
গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের করণীয়
গণমাধ্যমের দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ঘটনা রিপোর্ট করতে গিয়ে ভাষা ও শিরোনামে যেন বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত না থাকে। অপরাধের নাম স্পষ্ট করে বলতে হবে—প্রতারণা, সহিংসতা বা জোর—‘ধর্মীয় ষড়যন্ত্র’ নয়।
রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে—আইনের প্রয়োগ হবে নিরপেক্ষ ও কঠোর। ভুক্তভোগী যেই হোক, তার নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
‘লাভ জিহাদ’ বিতর্ক আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকটকে সামনে এনেছে—আমরা কি অপরাধের মূল কারণ খুঁজে সমাধান করব, নাকি ভয়ের রাজনীতিতে বিভক্ত হব? সম্পর্কের নামে প্রতারণা বা জোরপূর্বক আচরণের বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই জরুরি। তবে সেই লড়াই হতে হবে আইন, মানবিকতা ও যুক্তির ভিত্তিতে—বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে নয়।