রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনের হত্যা: পুলিশের ‘ইয়াবা তত্ত্ব’ ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন
সুশান্ত দাসগুপ্ত
সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনীতিবিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৩
158 জন পড়েছেন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ যে গল্প হাজির করেছে, সেটি শুনলে মনে হয় তদন্তের চেয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশের দাবি, পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে দুই তরুণ গণপতির বাড়িতে ঢুকে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি বাধা দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। এরপর পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকেও একে একে হত্যা করা হয়। চারটি হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নাকি গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার ইয়াবা সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করেছে, মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়েছে এবং পরদিন জুমার নামাজের সময় নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই ঘটনাস্থলের আলামতনির্ভর তদন্তের ফল, নাকি একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গভীরতর কারণকে চাপা দেওয়ার জন্য অতিদ্রুত তৈরি করা সুবিধাজনক ব্যাখ্যা?
সবচেয়ে বড় অসংগতি পুলিশের নিজের বক্তব্যেই। মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রাথমিক ধারণা ছিল, এটি পরিকল্পিত ডাকাতি। বাড়ির আলমারি ভাঙা, আসবাব তছনছ, স্বর্ণালংকারের বাক্স ছড়িয়ে থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার তথ্য সামনে এনে পুলিশ বলেছিল, ডাকাতি করতে গিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই বক্তব্য পাল্টে বলা হলো, ডাকাতির দৃশ্য সাজানো হয়েছিল। অথচ একই সঙ্গে পুলিশ আবার বলছে, বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং আটক ব্যক্তিদের দেখানো স্থান থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, স্বর্ণালংকার সত্যিই চুরি হয়ে থাকলে ডাকাতির ঘটনাকে নিছক সাজানো নাটক বলা হচ্ছে কেন? আর যদি ডাকাতি প্রকৃত উদ্দেশ্য না-ই হয়, তাহলে খুনিরা স্বর্ণালংকার নিয়ে পালাল কেন? পুলিশের প্রথম বক্তব্য ভুল ছিল, নাকি পরের বক্তব্য অসম্পূর্ণ?
আরেকটি প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে, কখন এবং কেন? দুই তরুণ যদি হঠাৎ ইয়াবা সেবনের সময় ধরা পড়ে আকস্মিক উত্তেজনায় চারজনকে হত্যা করে থাকে, তাহলে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন হলো কেন? এটি কি আগে থেকে নেওয়া কোনো প্রস্তুতি? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল হত্যার আগে, নাকি পরে? এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার রেকর্ড, বাড়ির প্রধান সুইচ, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং সম্ভাব্য সিসিটিভির কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে কি? একটি আকস্মিক মাদকসেবনকেন্দ্রিক ঝগড়ার সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি কীভাবে মেলে?
মোবাইল ফোন নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। নিহত পরিবারের স্বজন বলেছেন, চারজনের চারটি ফোনেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং প্রতিটি ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে বলছে, দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে বাকি দুটি ফোন কোথায়? চারটি ফোন কখন বন্ধ হলো? ফোনগুলোর সর্বশেষ কল, বার্তা, অবস্থান এবং তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কি? যদি কোনো হুমকি, চাঁদার দাবি, আর্থিক বিরোধ বা পূর্বপরিকল্পনার তথ্য ফোনে থেকে থাকে, তাহলে সেই তথ্য উদ্ধার না করেই ইয়াবাকে হত্যার একমাত্র কারণ হিসেবে ঘোষণা করার এত তাড়া কেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ ঘুরছে। কয়েকটি প্রকাশ্য পোস্টে দাবি করা হয়েছে, গণপতি চক্রবর্তীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল এবং তিনি সেই চাপের মুখে ছিলেন। এই অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি, তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যাচ্ছে না। কিন্তু অভিযোগটি যদি তদন্তযোগ্য হয়, তাহলে পুলিশ কি নিহত ব্যক্তির স্বজন, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও বাড়ির নির্মাণশ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? বাড়ি নির্মাণ নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল কি? স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী অর্থ দাবি করেছিল কি? থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি, অভিযোগ বা মৌখিকভাবে নিরাপত্তা চাওয়ার রেকর্ড আছে কি? চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য হলে তা গোপন করা অপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করবে, আর মিথ্যা হলে প্রমাণসহ সেটি খণ্ডন করাও পুলিশের দায়িত্ব।
পুলিশ বলছে, অভিযুক্ত দুই তরুণ নিহত পরিবারের পরিচিত। তাহলে প্রশ্ন, তারা যদি পরিচিতই হয়, একটি ছাদে ইয়াবা সেবনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়েই কেন একটি পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন করতে হবে? একজনকে হত্যা করার পর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না? স্ত্রী ও মেয়ে যখন পর্যায়ক্রমে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তখন কি কেউ চিৎকার করেননি? আশপাশের বাড়ির লোকজন কিছু শুনলেন না? আর ঘুমন্ত শিশুকে হত্যা করার প্রয়োজন কেন হলো, যদি সে কোনো ঘটনাই দেখে না থাকে? পরিচয় গোপন করার যুক্তিতে ঘুমন্ত শিশুকে হত্যার ব্যাখ্যা কোথায়? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে শুধু “পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়” বললেই কি চারটি হত্যার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?
অভিযুক্তরা নাকি হত্যার পরও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করেছে। গোসল করেছে, খাবার খেয়েছে, ইয়াবা সেবন করেছে এবং পরদিন দুপুরে বেরিয়ে গেছে। তাহলে এত সময়ের মধ্যে বাড়ির বাইরে তাদের উপস্থিতি, প্রবেশ বা বের হওয়ার কোনো ভিডিও ফুটেজ আছে? প্রতিবেশী কেউ তাদের দেখেছেন? বাড়ির মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ বা তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেলে তারা কীভাবে বের হলো এবং কে তালা লাগাল? চাবি কোথা থেকে এল? পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে ঢুকলে বের হওয়ার পথ কি একই ছিল, নাকি প্রধান ফটক ব্যবহার করা হয়েছে? আর যদি তারা সত্যিই আলামত নষ্ট করতে সচেতন হয়ে ফোন ডিটারজেন্টে ডুবিয়ে রাখে, তাহলে খেজুরের বিচি, মাদকসেবনের সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্ভাব্য নমুনা ফেলে রেখে গেল কেন?
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে জরুরি জায়গা, ফরেনসিক প্রমাণ। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ নিজেই জানিয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষার ফল তখনও আসেনি। আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, মৃত্যুর সময়, নিহতদের নখের নিচের নমুনা, অভিযুক্তদের শরীরে প্রতিরোধের চিহ্ন, গামছা বা রশিতে পাওয়া জৈব আলামত এবং ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার আগেই পুরো ঘটনার এত নিখুঁত বর্ণনা পুলিশ পেল কীভাবে? শুধুই আটক দুজনের কথিত স্বীকারোক্তি থেকে? যদি তাই হয়, তাহলে সেই স্বীকারোক্তি কি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া হয়েছে, নাকি পুলিশ হেফাজতে? বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারায় পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি সাধারণভাবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে বিচারিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আসার আগেই সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত ঘটনার মতো করে সব ঘোষণা করার উদ্দেশ্য কী?
এই হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক, অসাম্প্রদায়িক, মাদকসংক্রান্ত বা ডাকাতি বলে আগেভাগেই একটি খোপে বন্দী করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্য বের করা। নিহত ও অভিযুক্তদের ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে উদ্দেশ্য প্রমাণ হয় না। আবার ধর্মীয় পরিচয় দেখিয়ে সব প্রশ্ন বন্ধও করা যায় না। তদন্তকে অনুসরণ করতে হবে আলামত, অর্থের গতিপথ, ফোনের তথ্য, পূর্ববিরোধ, সম্ভাব্য চাঁদাবাজি, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধ এবং অপরাধের প্রকৃত পরিকল্পনা।
চারটি প্রাণহীন দেহের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের কাছে জনগণের প্রশ্ন একটাই, আপনারা কি সত্যিই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করছেন, নাকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি সহজ গল্প দাঁড় করিয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোকে কবর দিচ্ছেন? যদি আপনাদের বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করুন, স্বর্ণালংকার উদ্ধারের নথি দেখান, ফোনের তথ্য উদ্ধার করুন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের রহস্য ব্যাখ্যা করুন, সম্ভাব্য চাঁদাবাজির অভিযোগ যাচাই করুন এবং আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করুন। আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকে, তাহলে “ইয়াবা সেবনে বাধা” কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়। এটি কেবল পুলিশের একটি দাবি, যার ভেতরে এখনো অসংখ্য ফাঁক, অসংখ্য সন্দেহ এবং আড়ালে থাকা সম্ভাব্য সত্যের দীর্ঘ ছায়া।
সূত্র : সুশান্ত দাসগুপ্তের ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহীত