সনাতন দর্শন ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই জীবাত্মা কর্মচক্রের আবর্তে কখনো মনুষ্য, কখনোবা অন্য কোনো প্রাণীর দেহ ধারণ করে। সৃষ্টির বৈচিত্র্যের মাঝে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দেওয়া হয়েছে তার বুদ্ধি ও বিবেকবোধের কারণে। তান্ড্য ব্রাহ্মণে এই মানবদেহকে দেবতাদের আবাসস্থল হিসেবে মহিমান্বিত করে বলা হয়েছে, "নরাঃ দেবানাং গ্রামঃ"। অথচ পরিতাপের বিষয় এই যে, মানুষ তার আদিম অভিলাষ ও তথাকথিত আধ্যাত্মিক সন্তুষ্টির দোহাই দিয়ে অবলা ও নিরীহ প্রাণীদের জীবন হরণ করছে। এই রক্তবরণ উৎসব আদতে পরমেশ্বরের অভিপ্রায় হতে পারে না, কারণ তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সকল সৃষ্টির পরম পিতা।
অধ্যাত্মিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো করুণাময় পিতা যেমন তাঁর সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে তুষ্ট হতে পারেন না, তেমনি স্রষ্টাও তাঁর সৃষ্টির বিনাশে আনন্দিত হন না। মূলত এটি মানুষের চরম অজ্ঞানতা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। পরমাত্মার প্রকৃত সন্তুষ্টি নিহিত থাকে নিরীহ প্রাণের বিনাশে নয়, বরং সেই প্রাণের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবায়। মহাত্মা কৌটিল্য তাঁর চাণক্য নীতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আহার, নিদ্রা, ভয় আর বংশবিস্তার—এই প্রবৃত্তিগুলো মানুষ ও পশুর মধ্যে অভিন্ন। মানুষের প্রকৃত বিশেষত্ব তার জ্ঞানে; আর যে মানুষের এই বোধ বা জ্ঞান নেই, শাস্ত্রমতে সে পশুরই সমান।
বর্তমানে সময়ের দাবি হলো—ভক্তি বা বিশ্বাসের সার্থকতা অন্যের রক্তপাতে নয়, বরং নিজের ভেতরকার পশুত্বের বিসর্জনে খোঁজা। স্রষ্টার কাছে সেই উপচারই শ্রেষ্ঠ, যা প্রেম ও করুণায় সিক্ত। প্রকৃতি ও প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের পরম আরাধনা। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব দম্ভে নয়, বরং দয়ায় প্রমাণিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমর বাণী আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি বলেছিলেন— "জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" তাই কুসংস্কারের শিকল ভেঙে অবলা প্রাণীর আর্তনাদ থামিয়ে একটি অভয় পৃথিবী গড়ে তোলাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য। সৃষ্টির নিঃস্বার্থ সেবাতেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার প্রকৃত সন্তুষ্টি ও সনাতন ধর্মের মূল নির্যাস।