আত্মা ও মানবজন্মের দর্শন
কলমে : সুজিত ঘোষ,
লেখক কলামিষ্ট কবি ও সংগঠক
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৯
361 জন পড়েছেন
মানবজীবনের গভীরতম অনুসন্ধান তিনটি প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত—আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি? মৃত্যুর পর আমি কোথায় যাব? সভ্যতার আদিকাল থেকে মানুষ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে চলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম—সব পথ শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় আত্মা ও সত্তার রহস্যময় অনুসন্ধানে।
দেহ ও আত্মার পার্থক্য বোঝা এই অনুসন্ধানের প্রথম ধাপ। দেহ দৃশ্যমান, নশ্বর ও পরিবর্তনশীল; আত্মা অদৃশ্য, চেতনাময় ও অবিনশ্বর—এমনটাই প্রাচীন দর্শনের বক্তব্য। দেহ জন্মায়, বৃদ্ধি পায়, ক্ষয় হয় এবং একদিন বিলীন হয়। কিন্তু আত্মা দেহের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। সে কর্মের ধারক, সে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তাই ভাল-মন্দের ফল ভোগ করে আত্মাই।
আত্মার নেই আহার, নেই নিদ্রা, নেই বিশ্রাম। দেহে অবস্থানকালই তার “দিন”, আর দেহত্যাগ থেকে পুনর্জন্মের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সময় তার “রাত্রি”। এই দিন-রাত্রির অনুপাত প্রায় সমান—অর্থাৎ আত্মা যতদিন এক দেহে থাকে, ততদিনই সে পরবর্তী দেহ ধারণের প্রস্তুতিতে অবস্থান করে—যদিও ব্যতিক্রম ঘটে।
একটি দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ গ্রহণের সময় আত্মা প্রায় সব স্মৃতি বিস্মৃত হয়। যেমন মানুষ স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে তা ভুলে যায়, তেমনি আত্মাও নতুন জন্মে পুরনো স্মৃতি হারায়। তবে কিছু বিরল ক্ষেত্রে কেউ কেউ পূর্বজন্মের স্মৃতি স্মরণ করতে পারে; তাদের “জাতিস্বর” বলা হয়।
আত্মা নারী বা পুরুষ নয়। কর্মই নির্ধারণ করে পরবর্তী জন্মে তার লিঙ্গ, পরিবেশ ও পরিস্থিতি। এ ধারণা আমাদের শেখায়—জন্মগত অহংকার বা হীনমন্যতার কোনো ভিত্তি নেই; কর্মই আসল পরিচয়।
আরেকটি গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো—আত্মা ‘আমি’ নই, আত্মা ‘আমার’। আত্মা পরমাত্মার অংশবিশেষ। আমরা আত্মার ধারক, আত্মা আমাদের চেতনার শক্তি। মৃত্যুর সময় দেহের পঞ্চভূত প্রকৃতির পঞ্চভূতের সাথে মিশে যায়—মাটি মাটিতে, জল জলে, বায়ু বায়ুতে, আগুন আগুনে। কিন্তু আত্মা তার যাত্রা অব্যাহত রাখে।
শাস্ত্র অনুযায়ী আত্মা ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে মানবজন্ম লাভ করে—জলজ, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, পাখি, পশু হয়ে বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অবশেষে মানুষ হয়। এই দীর্ঘ অভিযাত্রার পর মানবজন্মকে তাই মুক্তির সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু মানুষ হয়ে জন্মালেই কি সত্যিকারের মানুষ হওয়া যায়? মানুষের আচরণে যখন হিংসা, লোভ, স্বার্থপরতা দেখা যায়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে উঠছি না? মানুষকে আলাদা করে তার বিবেক, তার আত্মচেতনা, তার নৈতিক বোধ।
এই কারণেই মানবজন্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্ম-অনুসন্ধান। আমরা কেন এসেছি, আমাদের কর্তব্য কী, মৃত্যুর পর আমাদের গন্তব্য কোথায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
স্রষ্টা যেন আমাদের এই সংসার-যাত্রায় “রিটার্ন রিজার্ভেশন” দিয়েই পাঠিয়েছেন। তাই জীবনকে কেবল ভোগের ক্ষেত্র না ভেবে, জ্ঞান, ভক্তি ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করাই শ্রেয়।
অতএব, মানুষ হয়ে আমাদের দায়িত্ব শুধু বেঁচে থাকা নয়, সচেতনভাবে বেঁচে থাকা। আত্মার জাগরণই মানবজন্মের সার্থকতা। যে ব্যক্তি নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে—“আমি কে?”—সে-ই প্রকৃত অর্থে মানুষ।