রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা : ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ হয়নি উত্তর নেই কিছু প্রশ্নের
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৪
22 জন পড়েছেন
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করে দুজন জবানবন্দি দেওয়ার পরও কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। পুলিশের গোয়েন্দা ও তদন্ত শাখা সিআইডির সদস্যরা কেন নিহতদের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংরক্ষণ করেননি? কেন খুনের দায়ে অভিযুক্তদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হলো না? তবে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেছেন, তদন্তের গতি-প্রকৃতিই বলবে কী হয়েছিল ঘটনার রাতে এবং আরও কেউ জড়িত কিনা? খুনের আরও কোনো মোটিভ ছিল কিনা? আরও কোনো আলামত সংগ্রহের দরকার আছে কিনা?
এদিকে মঙ্গলবার নগরীর কামালকাছনা দাসপাড়ায় (মাছুয়াপাড়া) নিজ বাড়িতে নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার স্ত্রীসহ দুই সন্তানের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। এতে স্বজন ও প্রতিবেশীরা অংশ নেন। এ ছাড়া রংপুর জিলা স্কুলে তাদের স্মরণসভা ও প্রার্থনা অনুষ্ঠান হয়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম : গণপতি চক্রবর্তীর কর্মস্থল রংপুর জিলা স্কুলের মাঠে আয়োজিত স্মরণসভা ও প্রার্থনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। এতে বক্তব্য দেন শিক্ষক সুধাংশু শেখর রায়, মিজানুর রহমান, সফিয়ার রহমান, নিরঞ্জন অধিকারীসহ সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকরা।
গ্রেফতার দুই যুবক ছাড়াও ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। আগামী তিন দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন না হলে রংপুর লকডাউন কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা। রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক সফিয়ার রহমান বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
রঙিন ধুতির আবদার ছিল দাদার কাছে : বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর কাছে রঙিন ধুতি চেয়েছিলেন গণপতি। ছোট ভাইয়ের সেই আবদার পূরণ করতে না পারার আক্ষেপ এখনো পোড়াচ্ছে তাকে। তাই লাশ সৎকারের সময় চিতার ওপর রঙিন ধুতি বিছিয়ে দিয়ে ছোট ভাইয়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করেন তিনি।
নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ : পুলিশ জানিয়েছে, মামলা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের আগে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়, বাসায় নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার ছিল কিনা এবং হত্যার পেছনে অন্য কোনো মোটিভ রয়েছে কিনা এসব তদন্তের আওতায় রয়েছে।
যেসব আলামত নজরে নেয়নি সিআইডি টিম : গোয়েন্দা দল প্রথম ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয়ে থাকা ফিঙ্গার প্রিন্ট সংরক্ষণ করেনি। এ ছাড়া খুনের দায়ে অভিযুক্তরা মাদকাসক্ত হয়ে থাকলে তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন থাকলেও তা করা হয়নি।
এ বিষয়ে রংপুর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত এসপি সুমিত চৌধুরী বলেন, ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাই সংগ্রহে রাখা হয়নি। অভিযুক্তদের রক্তের নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর কামালকাছনা দাসপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১১) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রোববার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই দিন রাতে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় তারা জবানবন্দি দিয়েছে।
পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় শেষ রাতের দিকে গণপতি ছাদে উঠলে তাদের দেখে ফেলেন। গণপতি তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় প্যাঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী প্রীতিলতা ছাদে এলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। পরে তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে ঘরে থাকা ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে তারা হত্যা করে।
মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানিয়েছেন, আমরা দ্রুত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নেওয়ার চেষ্টা করছি। ঘটনাস্থল পুলিশের পাহারায় ঘিরে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও আলামত দরকার হলে তা সংগ্রহ করা হবে। প্রথম দফায় পুলিশ ও সিআইডি যেসব আলামত সংগ্রহ করেছে, সেসব নিয়ে তদন্ত শুরু করেছি।