মাত্র ছয় বিচারিক কার্যদিবসে শিশু নন্দিনী রাণী হত্যাকান্ডের রায় ঘোষণা, প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১৫
66 জন পড়েছেন
মাত্র ছয় বিচারিক কার্যদিবসের মধ্যে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় সাত বছরের শিশু নন্দিনী রানী হত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রকে মৃত্যুদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় তার বাবা রনজিং কুমার রায়কে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে লালমনিরহাট দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী এ রায় ঘোষণা করেন। এ মামলার অন্য দুই আসামি বিধানের বাবা রনজিৎ কুমার ও মা মমতা রানীকে লাশ গুমে সহায়তার দায়ে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ের নথি থেকে জানা গেছে, জেলার আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের নলিনী মোহন বর্মণের সাত বছর বয়সী মেয়ে নন্দিনী রানী গত ১৫ জুন নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে স্থানীয় একটি ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওইদিনেই এ ঘটনায় নন্দিনীর বাবা নলনী মোহন বর্মন বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ বিধান চন্দ্র ও তার বাবা রনজিং কুমার রায়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটির রায়ের জন্য ২৩ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।
মামলা দায়েরের ২ মাস ৮দিন সময়ে গত ১৬ আগস্ট চার্জ গঠনের পর ২৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ৬ বিচারিক কার্যদিবসের মধ্যে রায় ঘোষণায় সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবি জানিয়েছে নন্দিনীর পরিবার।
রায়ের নথিতে বলা হয়েছে, বিধান চন্দ্রের বিরুদ্ধে আনা হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপর আসামি রনজিং কুমার রায়কে দণ্ডবিধির ৪০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডাদেশ দেন আদালত।
রায়ের নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিধান চন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদনসহ পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
রায়ে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংক্ষুব্ধ প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী লুৎফর রহমান রিপন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, নজিরবিহীন দ্রুততম সময়ে এই বিচার কাজ শেষ করে আদালত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এ. কে. এম. হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, শিশু নন্দিনী হত্যা মামলার রায়ে নিহতের পরিবার সন্তুষ প্রকাশ করেছে। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর দুই আসামিকে কারাদণ্ড দিয়েছেন। দ্রুত সময়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় ঘোষণা করে আদালত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
যেভাবে খুন করা হয় শিশু নন্দিনীকে:
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বিধান চন্দ্র (২১) ছিল নেশাগ্রস্ত। নেশার টাকার জন্য সে প্রায়ই বাড়িতে ভাঙচুর করত। ঘটনার দিন ১৫ জনু দুপুরে শিশু নন্দিনীকে বিস্কুট খাওয়ানোর কথা বলে নিজ বাড়িতে ডেকে নেয় বিধান। পরে ফুসলিয়ে কানের দুল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে কানের দুল ধরে স্বজরে টান দেওয়া হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে টিউবওয়েলে হেন্ডেলের সঙ্গে আঘাত লেগে মাথা ফেটে যায় নন্দিনীর। অজ্ঞান অবস্থায় নন্দিনীর রক্তাক্ত মাথা বেঁধে ফেলে এবং কানের দূল খুলে নেয় বিধান চন্দ্র। পরে ঘটনা দেখে ফেলে বিধান চন্দ্রের বাবা মা। বিকেল গড়িয়ে রাতেও জ্ঞান না ফেরায় উপায়ান্তর না পেয়ে মাটিতে পুতে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। পরে গভীর রাতে বাড়ির পাশে ভুট্টা ক্ষেতে গর্ত খুড়ে নন্দিনীকে পুতে ফেলা হয়।
পরদিন ভুট্টা ক্ষেত থেকে লাশ উদ্ধারের পর উত্তেজিত জনতা আসামির বাড়িতে আগুন দেয় এবং ডিসি-এসপিসহ সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে:
নন্দিনীর লাশ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের কাছ থেকে আটক বিধান চন্দ্রকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে জনতার ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হামলায় ১৮ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। ঘটনাস্থলে গেলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ প্রশাসনের কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে উত্তেজিত জনতা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় এবং বিক্ষোভকারীদের দাবির মুখে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।