ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের চ্যাট ঘিরে রংপুর হত্যাকাণ্ডে নতুন রহস্য, আগামী চক্রবর্তীর জিডি-এফআইআর নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫১
309 জন পড়েছেন
রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সন্তান আগামী চক্রবর্তীর একটি কথিত ফেসবুক মেসেঞ্জার কথোপকথনকে কেন্দ্র করে। আগামী চক্রবর্তীর স্কুলজীবনের বান্ধবী Shabila Naz Shoumi সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এসব স্ক্রিনশটের মধ্যে একটি কথোপকথনের সময় শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিট উল্লেখ থাকায় ঘটনাটির সময়কাল নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছিল, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কথিত মেসেঞ্জার চ্যাটের স্ক্রিনশট সত্যতা প্রমাণিত হলে সেখানে দেখা যায়, শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটেও আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বান্ধবীর কথোপকথন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই কথোপকথনে আগামী তাঁর বাসায় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন বলেও পোস্টে দাবি করা হয়েছে।
এ কারণে প্রশ্ন উঠছে, পুলিশের দেওয়া হত্যাকাণ্ডের সময় এবং কথিত মেসেঞ্জার কথোপকথনের সময়ের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না। একই সঙ্গে, ওই সময় পর্যন্ত আগামী চক্রবর্তী জীবিত ছিলেন কি না এবং কথোপকথনটি প্রকৃতপক্ষে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকেই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সময় বা পুলিশের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। স্ক্রিনশটের মূল উৎস, অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ, মেসেজের সময়, ডিভাইস ও অন্যান্য ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য যাচাই করলেই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছেন আগামী চক্রবর্তীর ওই বান্ধবী। তাঁর প্রকাশিত পোস্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ মে ও ২৩ মে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর মেসেজ আদান-প্রদান হয়েছিল। সেখানে আগামী জিডি ও এফআইআর করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি জিডি করলে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হবে কি না—এমন বিষয়েও তিনি জানতে চেয়েছিলেন বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য সত্য হলে তদন্তে স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কী কারণে আগামী চক্রবর্তী জিডি বা এফআইআর করার কথা ভাবছিলেন? তিনি কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চেয়েছিলেন? কোনো ব্যক্তি, পরিবার, জমি-সম্পত্তি, হুমকি, বিরোধ কিংবা অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত ছিল কি না—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কথিত ওই কথোপকথনগুলো হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন মাস আগে হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে মে মাসে জিডি বা এফআইআর নিয়ে আগামী চক্রবর্তীর উদ্বেগের সঙ্গে আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, নাকি এটি সম্পূর্ণ আলাদা কোনো বিষয়—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, শুক্রবার সকালের কথোপকথনটি প্রথমে এবং ২১ ও ২৩ মে-এর কথোপকথনগুলো পরে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কথোপকথনের স্ক্রিনশট বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে স্ক্রিনশটের সত্যতা, মেসেজের টাইমস্ট্যাম্প এবং সংশ্লিষ্ট ফেসবুক অ্যাকাউন্টের প্রযুক্তিগত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ঘটনাস্থলের বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ কী ছিল এবং সেটি হত্যাকাণ্ডের আগে না পরে ঘটেছিল—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের রেকর্ড, মিটার ও সংযোগের তথ্য, আশপাশের বাসিন্দাদের বক্তব্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য যাচাই করা হলে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সব মিলিয়ে আগামী চক্রবর্তীর কথিত মেসেঞ্জার চ্যাট, ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের কথোপকথন এবং মে মাসে জিডি-এফআইআর নিয়ে তাঁর পরামর্শ চাওয়ার বিষয়টি রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে নয়, বরং ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, কল ডিটেইলস, মেসেঞ্জার ডেটা, বিদ্যুৎ সংযোগের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগামী চক্রবর্তী কেন জিডি বা এফআইআর করতে চেয়েছিলেন, কার বিরুদ্ধে করতে চেয়েছিলেন এবং শুক্রবার ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের কথিত কথোপকথনের সত্যতা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই রংপুরের আলোচিত চার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।