ড্রামে ভরা ৬টি লাশ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক সনাতনী পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামে জমি দখলের লক্ষ্যে এক সনাতনী পরিবারের ৬ জন সদস্যকে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনা নিয়ে এই সংবাদ। মোঃ তাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং ড্রামে ভরে লাশ বিলে ফেলে দেয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৬
663 জন পড়েছেন
১৯৮৭ সাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথ হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন। তার এই আকস্মিক অন্তর্ধানের কারণ কেউ জানতে পারেননি। এর প্রায় দু বছর পর, ১৯৮৯ সালে, শশাঙ্কের গোটা পরিবার—তার স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান—একরাতের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়। গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে যে শশাঙ্ক আগেই ভারতে চলে গেছেন এবং সুযোগ বুঝে তার পরিবারকেও নিয়ে গেছেন। কিন্তু সত্য ছিল ভিন্ন।
শশাঙ্কের জমিজমা ও বাড়িঘর দখল করার লক্ষে পাশের গ্রামের কসাই মোঃ তাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা এঁটেছিল। তাজুল দাবি করত যে শশাঙ্ক জমি তাকে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই জমি নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি চললেও তা একসময় মিটে গিয়েছিল। তবে স্থানীয় কেউ কেউ শশাঙ্ককে গালাগালি করে বেঈমান ও মালাউন বলে অভিহিত করত।
কিন্তু কিছুদিন পরেই আসল ঘটনা প্রকাশ পায়। গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক ধুপাজুড়ি বিলে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। তার সন্দেহের ভিত্তিতে ড্রাম খুলে দেখা যায়, তাতে তিনটি লাশ রাখা হয়েছে। এরপর আরও তল্লাশি চালিয়ে আর একটি ড্রাম পাওয়া যায়, যাতে টুকরো টুকরো করে রাখা হয়েছে আরও তিনজনের লাশ। মোট ছয়টি লাশ ছিল শশাঙ্কের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের। শশাঙ্কের এক মেয়ে সুনীতিবালা শ্বশুরবাড়িতে থাকায় বেঁচে যান।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে শশাঙ্ককে জমি দখল করার উদ্দেশ্যে খুন করা হয় এবং লাশ গুম করা হয়। পরে এক রাতে পুরো পরিবারকে নৌকাযোগে অপহরণ করে হত্যা করে ড্রামে ভরে বিলে পুঁতে ফেলা হয়। দিনের বেলা তারা প্রচার করত যে বিরজাবালার পরিবার ভারতে চলে গেছে। মোঃ তাজুল ও তার সহযোগীরা এই হত্যাকাণ্ড চালায় এবং আদালতে তাজুল নিজে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিবরণ দেন। তার জবানবন্দীতে জানা যায় যে, তাজুল ও তার সহযোগীরা বিরজাবালা ও তার সন্তানদের হত্যা করার জন্য টাকার চুক্তি করেছিল। তারা ৫ই সেপ্টেম্বর রাতে নৌকায় করে শশাঙ্কের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় বিরজাবালা ও সন্তানদের অপহরণ করে ধোপাজুরি বিলে নিয়ে যায়। সেখানে তারা বিরজাবালা ও সন্তানদের হত্যা করে রামদা দিয়ে টুকরো টুকরো করে ড্রামে ভর্তি করে লবণ ও চুন মিশিয়ে বিলে ফেলে দেয়।
মোঃ তাজুল ও তার সহযোগীদের এই পাশবিক কাজের দায়ে ফাঁসি হয়। তাদের ফাঁসি কার্যকরের পর গ্রামের মানুষ মিষ্টি বিতরণ করেন এবং তাজুলের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রায় ৩৮ বছর আগের এই ঘটনাটি এখনও মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে আছে। এই ঘটনা নিয়ে 'কাঁদে নিদারাবাদ' নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয়। রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তী ও পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড আর একটি নিদারাবাদ কিনা, তা সঠিক তদন্তের পরেই বোঝা যাবে।