গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শ্রীরামের ছবি অবমাননার অভিযোগে দেশজুড়ে সনাতনীদের ক্ষোভ
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও দোষীদের বিচারের জোরালো দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১৪ জুন ২০২৬, ১৪:৪১
37 জন পড়েছেন
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের নির্মাণাধীন বিগ্রহের কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শ্রীরামের ছবি অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সনাতনী সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের কোমরপুর হাঁসবাড়ী গ্রামে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের একটি বিগ্রহ নির্মাণের কাজ চলছিল। সম্প্রতি ওই নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং অভিযোগ ওঠে যে, একদল ব্যক্তি জোরপূর্বক বিগ্রহ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ভগবান শ্রীরামের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এ ঘটনাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছেন।
ঘটনার পর বাংলাদেশ হিন্দু মহাসভার চেয়ারম্যান দীপক চন্দ্র গুপ্ত এবং মহাসচিব সুনীল শুভ রায় এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ন করে কোনো গোষ্ঠীর পক্ষেই অন্যের উপাস্য ও ধর্মীয় প্রতীককে অবমাননা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিগ্রহ নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু করার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অবমাননার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।
একই ঘটনায় সনাতনী সংগঠন ‘রাম সেবক’-এর পক্ষ থেকেও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের দপ্তর সম্পাদক শ্রী জয়ন্ত দাশ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাস্যের অবমাননা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে সনাতনী সংগঠক, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজসেবক টিম্পল পাল নিশান পলাশবাড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেছেন। জিডি নম্বর ৫৮০ এবং ট্র্যাকিং নম্বর TD8WBI। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, শ্রীরামের ছবি অবমাননা এবং বিগ্রহ নির্মাণে বাধা প্রদানের মাধ্যমে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রশাসনের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সনাতনীরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তারা শান্তিপূর্ণভাবে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির এক জরুরি সভায় সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উগ্রবাদী হুমকি ও চাঁদাবাজির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়। সভায় গাইবান্ধার রাধাগোবিন্দ মন্দিরকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, ধর্মীয় উসকানি ও বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তারা সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, গাইবান্ধার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজধানী ঢাকায় প্রতিবাদে মুখর হন শিক্ষার্থীরাও। বাংলাদেশ ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন হল ও অনুষদের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বক্তারা বলেন, ধর্মীয় অবমাননা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং জাতীয় সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ সনাতনী নাগরিক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং নেটিজেনরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই যে কোনো ধর্মীয় প্রতীক, উপাস্য বা বিশ্বাসের অবমাননার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে সমানভাবে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধারণকারী বাংলাদেশে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট সকল মহলের।