২২ জুন শুরু অম্বুবাচী: ধরিত্রী মাতার ঋতুচক্রকে ঘিরে বিশেষ ধর্মীয় আচার
হৃদয় চন্দ্র শীল
সুবর্ণচর প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২১ জুন ২০২৬, ১৪:০৬
38 জন পড়েছেন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আচার অম্বুবাচী আগামী ২২ জুন রাত ৯টা ১০ মিনিটে শুরু হবে এবং ২৬ জুন সকাল ৯টা ৩৩ মিনিটে নিবৃত্তি ঘটবে। ধরিত্রী মাতার বার্ষিক ঋতুচক্রকে কেন্দ্র করে পালিত এই উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের মন্দির, আশ্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী বা ধরিত্রী মা দেবী কামাখ্যারই এক রূপ। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে পৃথিবী মাতার ঋতুচক্র সংঘটিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই সময়কে ‘অম্বুবাচী’ নামে অভিহিত করা হয়। প্রকৃতি, সৃষ্টিশক্তি ও নারীত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের এক অনন্য উপলক্ষ হিসেবে এই আচার যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে।
‘অম্বু’ শব্দের অর্থ জল এবং ‘বাচী’ শব্দের অর্থ প্রকাশ বা স্ফুরণ। বর্ষাকালের সূচনালগ্নে যখন বৃষ্টির স্পর্শে মাটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে, তখনই অম্বুবাচী পালিত হয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই সময়ে ধরিত্রী মা নতুন সৃষ্টির শক্তি ধারণ করেন। তাই তাঁকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ পালন করা হয়।
অম্বুবাচীর সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ভারতের আসামের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক কামাখ্যা মন্দির-এ। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচীর তিন দিন দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী থাকেন। এ কারণে মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ রাখা হয় এবং নিয়মিত পূজা-অর্চনা স্থগিত থাকে। পরবর্তীতে বিশেষ স্নান, পূজা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করে মন্দিরের দ্বার পুনরায় ভক্তদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
অম্বুবাচী উপলক্ষে লক্ষাধিক ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী ও তীর্থযাত্রী কামাখ্যা মন্দিরে সমবেত হন। এই সময়কে শাক্ত সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, অম্বুবাচী চলাকালীন সময়ে মাটি খোঁড়া, হালচাষ, কোদাল চালানো কিংবা কৃষিকাজ থেকে বিরত থাকার প্রচলন রয়েছে। কারণ এই সময় ধরিত্রী মাতাকে ঋতুমতী অবস্থায় বিশ্রামরত বলে মনে করা হয়। অনেক পরিবারে রান্নাবান্না সীমিত রাখা হয় এবং ফলমূল, দুধ বা নিরামিষ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ব্রত পালন করা হয়।
এ সময় অনেক মন্দিরে নিত্যপূজা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও ভক্তরা জপ, ধ্যান, নামসংকীর্তন ও ধর্মীয় সাধনায় অংশগ্রহণ করেন। সাধু-সন্ন্যাসীরাও বিশেষ তপস্যা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনে নিমগ্ন থাকেন।
অম্বুবাচী নিবৃত্তির পর ভক্তদের মধ্যে দেবীর আশীর্বাদস্বরূপ লাল বা রক্তবর্ণের কাপড় বিতরণ করা হয়, যা ‘রক্তবস্ত্র’ নামে পরিচিত। ভক্তদের বিশ্বাস, এই রক্তবস্ত্র সৌভাগ্য, মঙ্গল এবং দেবীশক্তির আশীর্বাদের প্রতীক।
সনাতন ধর্মীয় দর্শনে অম্বুবাচী শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং প্রকৃতি, নারীত্ব ও সৃষ্টিশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য উৎসব। প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্তরা ব্রত, প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এই পবিত্র সময় পালন করবেন।