বিজ্ঞানের ‘মাল্টিভার্স’ বনাম সনাতন শাস্ত্র: আমাদের এই মহাবিশ্ব কি মহাবিষ্ণুর একটি লোমকূপ মাত্র?
আধুনিক বিজ্ঞানের 'Multiverse' তত্ত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে হাজার বছর আগের সনাতন শাস্ত্রে! মহাবিষ্ণুর নিঃশ্বাসে কীভাবে সৃষ্টি হচ্ছে কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড, তা জানতে পড়ুন "HINDUS NEWS"-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনটি।
সনাতনীদের এই পরম মহাজাগতিক সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রচলিত ধারণায় মানুষ যাকে সমগ্র সৃষ্টির শেষ সীমানা মনে করে, তা আসলে পরমেশ্বরের শরীরের একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও ব্রহ্মসংহিতার বিবরণ অনুযায়ী, সৃষ্টির আদি উৎস এবং এই অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি হলেন পরম পুরুষ 'মহাবিষ্ণু' বা 'কারণোদকশায়ী বিষ্ণু'। সনাতন সংস্কৃতির এই গভীর জ্ঞান কেবল আধ্যাত্মিকতার বিকাশ ঘটায় না, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সনাতনী দর্শনের যৌক্তিক ও মানবিক শ্রেষ্ঠত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
শাস্ত্রীয় ও মহাজাগতিক এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ক্ষীরোদকশায়ী বিষ্ণুর রূপের সাথে বেশি পরিচিত, যিনি ক্ষীর সাগরে শেষনাগের ওপর শায়িত থাকেন এবং যাঁর নাভিদেশ থেকে উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মা এই দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন। তবে শাস্ত্র স্পষ্ট করছে, এই ব্রহ্মা কেবল আমাদের এই একটি নির্দিষ্ট ইউনিভার্সের সৃষ্টিকর্তা। প্রকৃতপক্ষে মহাশূন্যে এমন কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড ভাসছে, যার আদি উৎস ও পরম আশ্রয় হলেন মহাবিষ্ণু। শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ও চৈতন্য চরিতামৃতের বর্ণনা অনুযায়ী, সৃষ্টির পূর্বে যখন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না, তখন এক অনন্ত আধ্যাত্মিক সমুদ্রের উপস্থিতি ছিল, যা 'কারণ-বারি' বা 'কারণ সমুদ্র' নামে পরিচিত। এই অনন্ত কারণ সমুদ্রের বুকে পরম পুরুষ মহাবিষ্ণু যোগনিদ্রায় মগ্ন থাকেন, যাঁর অলৌকিক বিশালতা ও তেজ মানুষের সাধারণ কল্পনার অতীত।
মহাবিষ্ণুর এই যোগনিদ্রা ও শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সের 'বাবল ইউনিভার্স' তত্ত্বের মূল ভিত্তি। পরমেশ্বর মহাবিষ্ণু যখন যোগনিদ্রায় থেকে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর শ্রীঅঙ্গের কোটি কোটি লোমকূপ থেকে সোনার ডিম্বাকৃতির অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড বুদবুদের মতো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই উৎপত্তিকৃত প্রতিটি ব্রহ্মাণ্ড বা ইউনিভার্সের অভ্যন্তরে মহাবিষ্ণু নিজের এক একটি অংশ প্রকাশ করেন, যাঁকে 'গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণু' বলা হয়। এই গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভিকমল থেকেই এক একজন ব্রহ্মার জন্ম হয়, যাঁরা নিজ নিজ নির্দিষ্ট ইউনিভার্সের সৃষ্টি ও স্থিতি পরিচালনা করেন।
আমাদের এই ইউনিভার্সটি তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় এখানকার ব্রহ্মার মস্তক সংখ্যা চারটি, তবে অন্য যেসব বিশাল আকৃতির ইউনিভার্স রয়েছে, সেখানকার ব্রহ্মাদের মাথার সংখ্যা শত কিংবা হাজারও হতে পারে। পরবর্তীতে মহাবিষ্ণু যখন পুনরায় শ্বাস গ্রহণ করেন, তখন মহাবিশ্বের নির্ধারিত সময়কাল বা 'মহাকল্প' সমাপ্ত হয় এবং মহাকাশে ভাসমান সেই কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড পুনরায় তাঁর লোমকূপে ফিরে গিয়ে পরম সত্তায় বিলীন হয়ে যায়।
এই মহাজাগতিক সত্যের সপক্ষে ব্রহ্মসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের আটচল্লিশ নম্বর শ্লোকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে উল্লেখ আছে যে, যাঁর একটিমাত্র নিঃশ্বাসের সময়কালকে অবলম্বন করে লোমকূপ থেকে উৎপন্ন ব্রহ্মাণ্ডসমূহের অধিপতি বা ব্রহ্মাগণ জীবিত থাকেন, সেই আদিপুরুষ মহাবিষ্ণুর আরাধনা করা হয়। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যা কোয়ান্টাম ফিজিক্স বা মাল্টিভার্স তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, সনাতন ধর্মে তা আদি যুগ থেকেই অত্যন্ত সহজ ও দিব্যভাবে ব্যাখ্যাত। সনাতন ধর্মের এই অসীম গভীরতা ও বিজ্ঞানসম্মত রূপটি প্রতিটি মানবজাতিকে প্রকৃতির প্রতি আরও সহনশীল এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে শেখায়, যা প্রকারান্তরে বিশ্বের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষার পথকে প্রশস্ত করে।