ভারতবর্ষের সাধক ও সনাতন সংস্কৃতির ইতিহাসে ভক্ত এবং ভগবানের এই মধুর সম্পর্কের বহু অলৌকিক ও দৈব ঘটনা যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে আলোর পথ দেখাচ্ছে। সাধক রামপ্রসাদ সেনের অনন্য ভক্তিতে বাঁধা পড়ে ব্রহ্মময়ী মা কালী স্বয়ং বেড়া বাঁধার জন্য তাঁর কন্যাসন্তানের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন। ভক্তের এই গভীর আকুতি ও ভগবানের প্রতিজ্ঞার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত মেলে দরিদ্র অথচ পরম তত্ত্বজ্ঞানী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত অর্জুন মিশ্রের জীবনে।
তৎকালীন সময়ে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র বা প্রিন্টিং প্রেস না থাকায় পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ হস্তলিখিত পুঁথি হিসেবে অনুলিপি করতে হতো। পণ্ডিত অর্জুন মিশ্র যখন শ্রীমদ্ভগবদগীতার অনুলিপি করছিলেন, তখন নবম অধ্যায়ের দ্বাবিংশ (২২) নম্বর শ্লোকটি লেখার সময় তাঁর মনে এক গভীর সংশয়ের উদয় হয়। শ্লোকটি ছিল:
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্।।
এই শ্লোকের মাধ্যমে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবজাতিকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, যে সমস্ত ভক্ত অনন্যচিত্ত হয়ে সর্বদা তাঁর উপাসনা করেন, সেই নিত্যযুক্ত ভক্তদের 'যোগ' অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অলব্ধ বস্তুর সংস্থান এবং 'ক্ষেম' অর্থাৎ লাভ করা বস্তুর সুরক্ষার দায়িত্ব ভগবান নিজে বহন করেন।
পণ্ডিত অর্জুন মিশ্র ভাবলেন, পরমেশ্বর তো সমস্ত জগতের দাতা, তিনি জীবকে সকল অলব্ধ বস্তু দান করতে পারেন, কিন্তু নিজে কেন সেই ভার বহন করতে যাবেন? এই যুক্তির বশে তিনি শ্লোকের ‘বহাম্যহম্’ (আমি বহন করি) শব্দটি কেটে সেখানে ‘দদাম্যহম্’ (আই দান করি) শব্দটি লিখে দেন। যার ফলে শ্লোকের মূল অর্থই পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই ঘটনার পরপরই লীলাময় ভগবান ভক্তের মনের সূক্ষ্ম অহংকার ও অবিশ্বাস দূর করতে এক পরম লীলার অবতারণা করেন।
সেদিন অর্জুন মিশ্রের ঘরে চরম অন্নকষ্ট চলছিল। স্ত্রীর অনুরোধে তিনি যখন বাইরে ভিক্ষার সন্ধানে বের হন, তার কিছু পরেই অপূর্ব সুন্দর, মনোহর রূপধারী দুটি বালক পিঠে ভারী খাবারের বস্তা নিয়ে অর্জুন মিশ্রের কুটিরে উপস্থিত হয়। বালক দুটির একজন কৃষ্ণবর্ণ এবং অন্যজন শ্বেতবর্ণ। তারা পণ্ডিত পত্নীকে জানায় যে, অর্জুন মিশ্র স্বয়ং রাজবাড়ি থেকে এই খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছেন। কিন্তু মিশ্র পত্নী গভীর বেদনার সাথে লক্ষ্য করেন, বালক দুটির পিঠ থেকে দরদর করে রক্ত ঝরছে। কারণ জিজ্ঞাসা করায় সুদর্শন বালকেরা উত্তর দেয়, তারা ভারী বোঝা বহন করতে পারছিল না বলে পণ্ডিত অর্জুন মিশ্র তাদের পিঠে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছেন।
মধ্যাহ্নের পর শূন্য হাতে ভগ্নহৃদয়ে অর্জুন মিশ্র যখন বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে জানান যে আজ উপবাসেই দিন কাটাতে হবে, তখন তাঁর স্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে বালকদের আগমন এবং তাদের পিঠে আঘাতের কথা বর্ণনা করেন। স্ত্রীর মুখে শ্যাম ও বলরাম সদৃশ দুই বালকের রূপের বর্ণনা শুনে পণ্ডিতের অন্তশ্চক্ষু উন্মোচিত হয়। তিনি বুঝতে পারেন, গীতায় ভগবানের নিজের হাতে লেখা ‘বহাম্যহম্’ শব্দটি কেটে ফেলার কারণেই আজ পরমেশ্বরের পিঠ রক্তাক্ত হয়েছে। নিজের চরম অপরাধ ও ভুল বুঝতে পেরে অর্জুন মিশ্র অশ্রুসিক্ত চোখে ‘দদাম্যহম্’ কেটে পুনরায় তিনবার ‘বহাম্যহম্’ লিখে ভগবানের চরণে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন এবং মার্জনা ভিক্ষা করেন।
সনাতন শাস্ত্র আমাদের শেখায়, ভগবানের এই বাণী ও প্রতিজ্ঞা চিরন্তন ও অব্যর্থ। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার মোহে মানুষ আজ জাগতিক মোহে অন্ধ। ভক্তকবি রজনীকান্ত সেনের লেখনীতে মানুষের এই আত্মকেন্দ্রিকতার রূপটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, যেখানে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন যে— সংসারের সকল তুচ্ছ কাজের জন্য মানুষের সময় থাকলেও, পরমেশ্বরকে ডাকার বা তাঁর প্রেমামৃত আস্বাদন করার সময় আধুনিক মানুষের নেই।
মহাভারতের কৌরব রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ঘটনাটিও সনাতনীদের জন্য এক পরম শিক্ষা। দ্রৌপদী যতক্ষণ নিজের শক্তিতে পরিধেয় বস্ত্র রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, ততক্ষণ তিনি কৃপা পাননি। কিন্তু যখনই তিনি সমস্ত আশা ত্যাগ করে দুই হাত তুলে ভগবানের চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলেন, তখনই স্বয়ং ভগবান অনন্ত বস্ত্রের রূপ ধারণ করে তাঁর সম্মান রক্ষা করলেন এবং কৌরবদের সমস্ত কুরুচিপূর্ণ ও অন্যায় প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিলেন।
আজকের অশান্ত ও মানবিকতাহীন পৃথিবীতে মানুষের অধিকার ও আত্মিক মুক্তির একমাত্র পথ হলো পরমেশ্বরের প্রতি এই প্রকার অবিচল বিশ্বাস ও সম্পূর্ণ শরণাগতি। নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং অনন্যচিত্তে সর্বদা ঈশ্বরকে স্মরণের মাধ্যমেই কেবল মানবজীবন সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ও পাপের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারে, কারণ ভক্তের সেই ভার বহনের জন্য ভগবান সর্বদা প্রস্তুত।