গাজন থেকে চড়ক: বাংলার বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতিতে বুড়ো শিবের কৃপা
চিরনজিত চন্দ্র বাইন
ভোলা জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৪০
129 জন পড়েছেন
চৈত্র মাস এলেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে শুরু হয় এক বিশেষ আবহ—ঢাকের গর্জন, ভক্তির উন্মাদনা আর ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। এই সময়েই পালিত হয় শিবের গাজন, যা ধীরে ধীরে চূড়ান্ত পর্ব চড়ক পূজোর দিকে এগিয়ে যায়। একসময় গ্রামবাংলার সর্বত্র জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হলেও, আধুনিকতার চাপে এই ঐতিহ্য আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
গাজন মূলত শিবভক্তদের ত্যাগ ও সাধনার উৎসব। সারা চৈত্র মাস জুড়ে সন্ন্যাসীরা কঠোর ব্রত পালন করেন এবং হাতে ধারণ করেন পবিত্র বেতের ছড়ি। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই ব্রত নিষ্ঠার সাথে পালন করলে ভক্তরা পরকালে শিবলোকে স্থান লাভ করেন।
উৎসবের সূচনা হয় ‘পাটাস্নান’-এর মাধ্যমে, যেখানে কাঠের পাটায় শায়িত মহাদেবের প্রতিমা গঙ্গাজলে স্নান করানো হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই আচার জগৎপিতার তাপ প্রশমিত করে এবং প্রকৃতিতেও আনে শীতলতা।
গাজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর অংশ হলো ‘ঝাঁপ’। উঁচু মাচা থেকে সন্ন্যাসীরা আগুন, কাঁটা বা ধারালো বস্তুর ওপর ঝাঁপ দেন। এই দৃশ্য যেমন ভয়ংকর, তেমনি ভক্তদের কাছে এটি অটুট বিশ্বাসের প্রতীক। তাঁদের মতে, মহাদেবের অদৃশ্য কৃপাই তাঁদের রক্ষা করে।
চৈত্র সংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়ক পূজা, যা গাজনের চূড়ান্ত পর্ব। উঁচু খুঁটির সাথে বাঁধা হয়ে সন্ন্যাসীরা শূন্যে ঘোরেন, কখনো পিঠে বড়শি গেঁথে। দর্শনার্থীদের ভিড় ও মেলার আয়োজন এই উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত।
চড়কের আগের দিন পালিত হয় নীল ষষ্ঠী। এদিন মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় উপোস থেকে শিবের পূজা করেন এবং নীল বাতি জ্বালান। এতে গাজন উৎসব পারিবারিক আবহে আরও গভীরতা পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, সময়ের পরিবর্তনে এই লোকসংস্কৃতি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। তবুও এখনও কিছু গ্রামে ভক্তি ও ঐতিহ্যের টানে গাজন ও চড়ক পূজা টিকে আছে।
বাংলার এই প্রাচীন লোকঐতিহ্য শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, সাহস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত নিদর্শন—যা সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।