আদ্যাশক্তি কালীই কামাখ্যা: সনাতন দর্শনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক রহস্য ও মহামায়ার অমোঘ মহিমা
সনাতন ও শাক্ত শাস্ত্রের আলোকে আদ্যাশক্তি কালী ও দেবী কামাখ্যার অভেদ তত্ত্ব এবং বিশ্বসৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মহামায়ার পরম মহিমা এই প্রতিবেদনে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ শিবের বাণী ও তন্ত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেবী কামাখ্যার আরাধনাই যে জীবের মুক্তি ও সর্বসিদ্ধির একমাত্র পথ, তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্পন কর্মকার
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত:
১৯ জুন ২০২৬, ০১:২৮
33 জন পড়েছেন
সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি এবং শাক্ত দর্শনের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক রহস্য উন্মোচিত হয়েছে আদ্যাশক্তি মহামায়া কালী ও দেবী কামাখ্যার অভেদ তত্ত্বের মাধ্যমে। শাস্ত্রমতে, যিনি সৃষ্টির আদি উৎস আদ্যাশক্তি কালিকা, তিনিই নীলকূটের কামরূপিণী কামাখ্যা। মহাজাগতিক এই পরম সত্যকে পাশ কাটিয়ে কোনো সাধকের পক্ষেই পূর্ণতা লাভ করা সম্ভব নয়। দেবী কামাখ্যার মহিমাময় আরাধনা ব্যতীত দেবীর সকল বিদ্যার সুসাধকও পদে পদে বিঘ্নের সম্মুখীন হন। ফলস্বরূপ, শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, সৌর ও গাণপত্য—এই পঞ্চ মতের সকল অনুসারীকেই মহামায়ার চরণে শরণাগত হতে হয়। জগতের স্থাবর-অস্থাবর, জড়-চেতন যা কিছু বিদ্যমান, সবই তাঁর অচিন্ত্য মায়াশক্তি দ্বারা আবৃত। কামাখ্যাতন্ত্রের দ্বিতীয় পটলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, সর্ববিদ্যার সাধককে অবশ্যই দেবী কামাখ্যার আরাধনা করতে হবে, অন্যথায় সিদ্ধিহানি নিশ্চিত। সমস্ত জীবজগৎ মহামায়ার মায়াজালে এমনভাবে আবদ্ধ, যেমন তৈলযন্ত্রে বৃষ বা ঘানির বলদ আবদ্ধ থাকে।
কামাখ্যাতন্ত্রের প্রথম পটলের বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী কামাখ্যা হলেন নিত্যা, বরদাত্রী এবং সাধকের মহাবিভব ও আনন্দ বর্ধনকারিণী। তিনি ত্রিভুবনের সকল জীবের জননী ও পরম ত্রাণকর্ত্রী। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এবং চন্দ্রসহ সকল দেবগণ সর্বদা তাঁর সেবা করে থাকেন এবং দেবতাদের মূল দেবত্ব শক্তিই হলেন এই কামরূপিণী কামাখ্যা। তন্ত্রশাস্ত্রে লক্ষ-কোটি মহাবিদ্যার কথা বলা হলেও, সর্বশ্রেষ্ঠ ষোড়শী বিদ্যার মূল কারণও হলেন জগদম্বিকা কালিকা। চন্দ্রের কান্তি যেভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পুনরায় উদিত হয়, ঠিক তেমনি এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় দেবী কামাখ্যার ইচ্ছাতেই সম্পন্ন হয়। তিনি ছাড়া এই ত্রিভুবনে দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বার অস্তিত্ব নেই। যে মানব এই পরম তত্ত্বের প্রতি বিমুখ হয়, সে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে নিন্দিত ও গতিহীন হয়ে পড়ে। দেবী কামাখ্যাই সাধকের ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ প্রদান করেন। তিনিই জীবের সালোক্য ও সারূপ্য মুক্তির একমাত্র পরম গতি। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
পবিত্র কালিকাপুরাণের ৬২ তম অধ্যায়ে স্বয়ং ভগবান শিব দেবী কামাখ্যার এই অলৌকিক মাহাত্ম্য ও স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। মহাদেব বলেছেন, দেবী মহামায়া তাঁর সাথে পরম আনন্দলীলা অনুভবের নিমিত্ত নীলকূটের নির্জন পর্বত প্রদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলেই তিনি ‘কামাখ্যা’ নামে খ্যাত। তিনি জগতের সৃষ্টি স্থায়িত্বের মূল প্রকৃতিরূপা এবং সৃষ্টি রহস্যের প্রতীক স্বরূপ যোনিচিহ্নে পূজিতা। ভগবান বিষ্ণু যখন মধু ও কৈটভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, তখন এই মহামায়াই মহাজাগতিক মোহ বিস্তার করে অসুরদের বিভ্রান্ত করেছিলেন। তিনি একাধারে কামদা, কামিনী, কান্তা এবং কামাঙ্গনাশিনী। সমগ্র সৃষ্টিকে নিয়োজিত ও পরিচালিত করাই এই আদিপ্রকৃতির মূল লীলা।
কামাখ্যাতন্ত্রের দশম পটল অনুযায়ী, কৃষ্ণবর্ণা জগদ্ধাত্রী কালিকা ও দেবী কামাখ্যার মাঝে কোনো ভেদ নেই। যিনিই কালিকা মাতা, তিনিই কামাখ্যা এবং তিনিই পরম ব্রহ্ম। নিখিল বেদ এবং অখিল তন্ত্রশাস্ত্রের এটাই একমাত্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি অপরিমেয় বীর্যের অধিকারী এবং করুণার মহাসমুদ্র। যজ্ঞ শেষে দক্ষিণা প্রদান করলে যেভাবে কর্মের পূর্ণ ফল লাভ হয়, ঠিক তেমনি দেবী কালিকা জীবের সকল কর্মের ফল এবং পরম মুক্তি প্রদান করেন বলেই তাঁকে ‘দক্ষিণা কালী’ নামে অভিহিত করা হয়। ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী কর্তৃক আলোচিত সনাতন শাস্ত্রের এই অমোঘ বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জগতের একমাত্র অবিনশ্বর সত্য হলেন আদ্যাশক্তি মহামায়া, যিনি সকল ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র মানবজাতি ও জীবের পরম কল্যাণ ও অধিকার রক্ষা করে চলেছেন।