ত্রিপিটকের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভগবান বুদ্ধ স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষ যার কাছ থেকে ধর্ম শিক্ষা লাভ করে, তাকে দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায় পূজা করা কর্তব্য। একজন সুযোগ্য শিক্ষাগুরু যখন মেধাবী ও বিনয়ী শিষ্যের প্রতি প্রসন্ন হন, তখনই তিনি বহুশ্রুত ধর্মের গূঢ় রহস্য প্রকাশ করেন। বুদ্ধের মতে, যারা ক্ষুদ্র হৃদয়ের, নির্বোধ এবং শাস্ত্রজ্ঞানহীন ব্যক্তিদের অনুসরণ করে, তারা আমৃত্যু সন্দেহের দোলাচলে থেকে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। পক্ষান্তরে, বেদ সম্যকরূপে অবগত ব্যক্তিরাই প্রকৃত ‘বিভাবী’ বা প্রতিভাদীপ্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
সংবাদ ভাষ্যে দেখা যায়, বুদ্ধ নৌকার রূপক ব্যবহার করে অত্যন্ত সুচারুভাবে বেদজ্ঞদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যেমন একজন দক্ষ মাঝি একটি মজবুত নৌকার সাহায্যে উত্তাল নদী পার করতে পারেন, তেমনি একজন ‘বেদজ্ঞ’ ও ‘ভাবিতাত্মা’ ব্যক্তিই এই সংসার সমুদ্রের মোহ থেকে জীবকুলকে উদ্ধার করার সামর্থ্য রাখেন। সুত্তনিপাতের চূলবগ্গের ‘কিংসীল সুত্তে’ আরও বলা হয়েছে, যারা শ্রুতি বা বেদের মাধ্যমে সমাধি লাভ করেন, তাদের প্রজ্ঞা ও শ্রুতিজ্ঞান দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং তারা বচন, মনন ও কর্মে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।
গবেষক ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী উল্লেখ করেছেন যে, ভগবান বুদ্ধ কেবল বেদের প্রশংসাই করেননি, বরং ‘বেদজ্ঞ’ হওয়ার প্রকৃত সংজ্ঞাও প্রদান করেছেন। বুদ্ধের মতে, শ্রমণ বা ব্রাহ্মণদের জ্ঞাতব্য সকল জ্ঞান অর্জন করে যিনি অনাসক্ত হতে পেরেছেন, তিনিই প্রকৃত বেদজ্ঞ। এখানে লক্ষণীয় যে, বুদ্ধের দর্শনে বারবার যে ‘সমাধি’ শব্দটি এসেছে, তা প্রাচীন বৈদিক ষড়দর্শনের অন্তর্ভুক্ত মহর্ষি পতঞ্জলির ‘যোগদর্শন’ থেকে গৃহীত।
বর্তমানে একদল বিভ্রান্ত বিশেষ করে নববৌদ্ধ মতাদর্শীরা দাবি করেন যে, বুদ্ধ বেদোপদিষ্ট আর্যধর্মের বিরোধী ছিলেন। শাস্ত্রীয় প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং শাস্ত্র পাঠ না করার অজ্ঞতা মাত্র। মূলত, বুদ্ধের শিক্ষা এবং বৈদিক আর্যধর্ম একই তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, যেখানে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি হিসেবে ‘বেদজ্ঞান’ ও ‘প্রজ্ঞা’কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রীয় এই সত্য অনুধাবনের মাধ্যমেই বৌদ্ধ ও সনাতন দর্শনের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি পুনর্প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করছেন ধর্মপ্রাণ বিশ্লেষক সমাজ।