সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কোন দয়া নয়—কোন সংখ্যাগুরুর অনুগ্রহও নয়,কোন রাজনৈতিক দলের উপহার নয়।
হেমন্ত দাস
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত:
২৩ আগস্ট ২০২৬, ০১:২০
15 জন পড়েছেন
হেমন্ত দাস: স্টাফ রিপোর্টার।
ডেডলাইন: ২০২৪–২০২৫
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কি সত্যিই ‘জামাই আদরে’ আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়—ইতিহাস, নথি, সংবাদ প্রতিবেদন এবং রাষ্ট্রীয় ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য দিয়ে খোঁজা প্রয়োজন।
কারণ একটি দেশের কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা নির্ভর করার কথা নয় সে সংখ্যাগুরু নাকি সংখ্যালঘু—নির্ভর করার কথা তার নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সময়ে হামলা, মন্দির ও উপাসনালয়ে আক্রমণ, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, প্রতিমা ভাঙচুর, ভূমি দখল, ভয়ভীতি, নারী নির্যাতনসহ নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। অতীতের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিচার ও দায় নির্ধারণ না হলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা কঠিন।
২০০১–২০০৬: ক্ষত তৈরি হয়েছিল তখনও
২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, নির্যাতন, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের বহু অভিযোগ সামনে আসে। এসব ঘটনার বিচার ও দায়বদ্ধতা নিয়ে পরবর্তী সময়েও বিতর্ক অব্যাহত ছিল।
২০০৬–২০০৮: রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়েও নিরাপত্তাহীনতা
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের সময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর বিচ্ছিন্ন হামলা, ভূমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং উপাসনালয়ে আক্রমণের অভিযোগও সামনে এসেছে। অর্থাৎ সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনো এক সরকারের সময়ের একক সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো ইতিহাসটি ধরা পড়ে না।
২০০৯–২০২৪: ঘটনাপঞ্জি থামেনি
এই দীর্ঘ সময়েও বিভিন্ন জেলায় মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘরে হামলা, জমি দখলের অভিযোগ এবং ধর্মীয় বিদ্বেষকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পুরোনো মানবাধিকার প্রতিবেদনে ২০০৮–০৯ সময়েও হত্যা, মন্দির দখল বা হামলা, জমি দখল, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো অভিযোগ নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
৫ আগস্ট ২০২৪: নতুন করে ভয়াবহ প্রশ্ন
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বহু ঘটনা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যায়ে নথিভুক্ত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (EUAA)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) ২০২৪ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ১৪৭টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছিল, যার ৮১টিই আগস্টে ঘটে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪–২০ আগস্ট ২০২৪ সময়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ১,৭৬৯টি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা জানিয়েছিল; পুলিশ তদন্ত করে এসবের বড় অংশকে রাজনৈতিক পটভূমিসম্পন্ন বলে উল্লেখ করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে ৫–১৫ আগস্টের মধ্যে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ৩৭টি সহিংস হামলার তথ্যও উঠে এসেছে; এসবের মধ্যে বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং মন্দিরে হামলার ঘটনাও ছিল।
অর্থাৎ, ঘটনা ছিল—প্রশ্ন হলো প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ কী এবং প্রতিটি অপরাধের বিচার কতটা হয়েছে।
২০২৫: প্রশ্নটি আরও গভীর হয়েছে
২০২৫ সালেও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ থামেনি। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নিজস্ব হিসাবে ২০২৫ সালে ৫২২টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে—যার মধ্যে হত্যা, নারী নির্যাতন/ধর্ষণ, উপাসনালয়ে হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং জমি দখলের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি ওই সংগঠনের নিজস্ব নথিভুক্ত হিসাব; বিভিন্ন সংস্থার সংজ্ঞা ও পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় সংখ্যাগুলো সরাসরি একে অপরের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।
তাহলে ‘জামাই আদর’ কথাটি কোথায়?
যে পরিবার তার ঘর, জমি, মন্দির, ব্যবসা কিংবা নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকে—তার কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত:
আমি কি নিরাপদ?
আমার সম্পত্তি কি নিরাপদ?
আমার উপাসনালয় কি নিরাপদ?
আমার মা-বোন কি নিরাপদ?
অপরাধ হলে কি অপরাধীর বিচার হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে ‘জামাই আদর’ ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান বাস্তবতার বিকল্প হতে পারে না।
সংখ্যালঘু নির্যাতন কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়
একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা জরুরি—
সংখ্যালঘুর ওপর হামলা যদি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী করে, তার বিচার হতে হবে।
যদি কোনো ধর্মীয় উগ্রবাদী করে, তার বিচার হতে হবে।
যদি স্থানীয় সন্ত্রাসী বা ভূমিদস্যু করে, তার বিচার হতে হবে।
আর যদি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধকে সাম্প্রদায়িকতার রূপ দেওয়া হয়, তাহলেও অপরাধীর বিচার হতে হবে।
কারণ অপরাধীর পরিচয় নয়—অপরাধই বিচারের প্রধান বিষয়।
ইতিহাসের শিক্ষা
৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৫, কিংবা তারও আগে ২০০১–২০০৬, ২০০৬–২০০৮, ২০০৯–২০২৪—প্রতিটি সময়ের ঘটনাকে দলীয় চশমায় দেখলে সত্যের একটি অংশই দেখা যাবে।
সত্যের পূর্ণ ছবি পেতে হলে প্রয়োজন—
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত,
ভুক্তভোগীর বক্তব্য,
প্রমাণের সংরক্ষণ,
অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ,
মামলা ও বিচারিক অগ্রগতি,
এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়।
কোনো রাজনৈতিক দলের উপহার নয়।
কোনো সংখ্যাগুরুর অনুগ্রহও নয়।
এটি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
তাই প্রশ্নটি শুধু—
“বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কি জামাই আদরে আছে?”
প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
“বাংলাদেশের একজন সংখ্যালঘু নাগরিক কি তার ধর্ম, পরিচয়, জমি, ঘর, মন্দির, পরিবার ও জীবন নিয়ে ভয়হীনভাবে বাঁচতে পারছেন?”
যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর হবে—“হ্যাঁ, আইনের চোখে সবাই সমান এবং অপরাধীর পরিচয় যাই হোক, বিচার নিশ্চিত”—সেদিনই আমরা সত্যিকারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ দাবি করতে পারব।
সংখ্যালঘু সুরক্ষা মানে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ সুবিধা নয়—
সংখ্যালঘু সুরক্ষা মানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হলো—
অন্যায়ের বিচার না হলে অন্যায় ফিরে আসে।
আজ যার ঘর পুড়ছে, কাল আগুন আপনার দরজাতেও পৌঁছাতে পারে।