যেখান থেকে শুরু হয়েছিল হরিনামের বিশ্বজাগরণ: মায়াপুরের ইতিহাস ও মহিমা
হৃদয় চন্দ্র শীল
সুবর্ণচর প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২২ জুন ২০২৬, ০৫:৫৬
26 জন পড়েছেন
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার পবিত্র মায়াপুর ধামে অবস্থিত শ্রী মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈষ্ণব তীর্থকেন্দ্র। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই মন্দির কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম, ভক্তি ও নামসংকীর্তনের আদর্শকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এক মহৎ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর বিশ্ব সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত।
১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দে মায়াপুরে আবির্ভূত হন যুগাবতার শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু। তিনি হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা করেন এবং ধর্ম, জাতি ও বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সকল মানুষকে ভগবানের প্রেমে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানান। তাঁর প্রচারিত ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোটি কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।
ইতিহাসের নানা পর্যায়ে গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তন ও অন্যান্য কারণে মহাপ্রভুর প্রকৃত জন্মস্থান লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মহান বৈষ্ণব আচার্য শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর গবেষণা, প্রাচীন নথি ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মায়াপুরের যোগপীঠ পুনরাবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এই পবিত্র স্থানের মাহাত্ম্য দেশ-বিদেশে প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৬ সালে নিউইয়র্কে ইসকন প্রতিষ্ঠার পর এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর গুরুর ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মায়াপুরকে আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জমি ক্রয় ও আশ্রম নির্মাণের মাধ্যমে শ্রী মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রভুপাদের দূরদর্শিতা ও ভক্তদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আজ এটি একটি বিশাল আধ্যাত্মিক নগরীতে পরিণত হয়েছে।
মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে শ্রীশ্রী রাধামাধব ও অষ্টসখী, শ্রীশ্রী পঞ্চতত্ত্ব এবং শ্রী প্রহ্লাদ নৃসিংহদেবের বিগ্রহ। প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী এখানে দর্শন, কীর্তন ও পূজায় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে সন্ধ্যা আরতি ও মহাসংকীর্তন ভক্তদের জন্য এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
মায়াপুরের আধুনিক ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘টেম্পল অব দ্য বৈদিক প্ল্যানেটোরিয়াম’ (TOVP)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বৈদিক মন্দির প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে নির্মিত হচ্ছে। বিশাল গম্বুজ, বৈদিক মহাজাগতিক তত্ত্বভিত্তিক প্রদর্শনী এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রকল্প বিশ্বজুড়ে ভক্ত ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে মায়াপুরকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের বিশ্বরাজধানী বলা হয়। প্রতিবছর গৌর পূর্ণিমা, নবদ্বীপ মণ্ডল পরিক্রমা, কীর্তন মেলা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে লাখো ভক্ত এখানে সমবেত হন। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের মানুষ একত্রিত হয়ে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেম ও ভক্তির বার্তা ধারণ করেন।
শতাব্দীপ্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মভূমির মাহাত্ম্য এবং আধুনিক বিশ্বে বৈষ্ণবধর্মের বিস্তারের কেন্দ্র হিসেবে শ্রী মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির আজও কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি কেবল একটি মন্দির নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ভক্তি, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক।