সংখ্যালঘু হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৮
333 জন পড়েছেন
গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছিনতাই, হত্যা সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক অভিযোগ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে স্পষ্ট করেছে। একের পর এক ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ মানুষ, আতঙ্কে ঘরছাড়া হচ্ছে পরিবার। প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ?
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও সামাজিকভাবে আলোচিত তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যেসব ব্যক্তি হত্যার শিকার হয়েছেন বা নির্মম সহিংসতার বলি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে—তাদের মধ্যে দিপু দাস, অমৃত মণ্ডল, মনি চক্রবর্তী, রানা প্রতাপ, খোকন দাস ও স্বপন বল (কালু)–এর নাম উল্লেখযোগ্য। প্রায় সব ঘটনায় পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ একই—হামলার আগেই হুমকি ছিল, ঘটনার সময় প্রশাসনের কার্যকর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি এবং ঘটনার পর বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশেষভাবে আলোচিত দিপু দাস হত্যাকাণ্ডে পরিবারের দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই বর্বরতার বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্তদের মধ্যে কিছু দ্রুত গ্রেপ্তার হলেও ও দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি না থাকায় জনমনে ক্ষোভ ও ভয় আরও বেড়েছে। এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক।
অন্য ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও ভূমি ও সম্পত্তি বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বসতবাড়িতে হামলা, কোথাও পরিকল্পিত ভয়ভীতি প্রদর্শন—সব মিলিয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায় স্পষ্ট। অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে সমতা, অনুচ্ছেদ ৩১ আইনের আশ্রয় লাভ এবং অনুচ্ছেদ ৩২ জীবন রক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি অনুচ্ছেদ ৪১ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বাস্তবে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এসব অনুচ্ছেদের কার্যকর প্রয়োগ বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)–এ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। এসব সনদে জীবন, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীন আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে, অথচ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক সহিংসতা কোনো একক সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?
কলমে: সুজিত ঘোষ
লেখক, কলামিষ্ট, কবি ও সংগঠক।