প্রবীণরা অবহেলার পাত্র নন, অভিজ্ঞতার আধার: লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) তপন মিত্র চৌধুরী
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠী একাকীত্ব, চিকিৎসা সংকট ও পারিবারিক অবহেলার শিকার হচ্ছেন, যা তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করছে। প্রবীণদের মৌলিক অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
জন্ম ও মৃত্যুর মতোই মানুষের জীবনচক্রে রয়েছে কয়েকটি স্বাভাবিক ধাপ—শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং বার্ধক্য। যারা দীর্ঘজীবন লাভ করে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের অধিকাংশেরই একই স্বপ্ন থাকে—জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবার পরিজনদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কাটিয়ে একদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া। কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।
বার্ধক্যে পৌঁছানোর সাথে সাথে মানুষের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, একাকীত্ব, আয় অভাব, পরনির্ভরতা এবং সামাজিক অবহেলার মতো নানামুখী সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। শৈশবে যেমন সন্তানদের সার্বক্ষণিক যত্ন নিতে হয়, বার্ধক্যে এসে অনেক প্রবীণ প্রবীণদেরও ঠিক তেমনই যত্নের প্রয়োজন হয়। যৌথ পরিবার ভাঙনের ফলে এবং আধুনিক একক পরিবারের প্রসারে প্রবীণরা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হলো একাকীত্ব। সন্তানরা কাজ কিংবা পড়াশোনার সুবাদে বাইরে বা বিদেশে থাকায় প্রবীণদের দীর্ঘ সময় একা কাটাতে হয়, যা তাঁদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও প্রবীণরা নানা জটিলতায় ভোগেন। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, বাত, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখনো শহরকেন্দ্রিক এবং চিকিৎসা ব্যয় অধিকাংশ প্রবীণদের নাগালের বাইরে। আর্থিক অনিশ্চয়তা প্রবীণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন পেলেও অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য বর্তমানে যে বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয় (প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা), তা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে অত্যন্ত অপ্রতুল। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
প্রবীণদের এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা শারীরিক নয়, এটি মানবিক ও মানবাধিকারের বিষয়। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পরিবারে ও সমাজে প্রবীণ নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। এছাড়া ডিজিটাল প্রযুক্তির বৈষম্য ও প্রবীণবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে হাঁটাচলা ও চলাফেরায় তাঁরা প্রতিনিয়ত বিপাকের মুখে পড়ছেন। প্রবীণদের সমস্যা দূর করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বল্পমূল্যে জেরিওট্রিক চিকিৎসা, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রবীণ কর্নার চালু এবং প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।
একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেয়—তার ওপর। প্রবীণদের মানবাধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তবেই গড়ে উঠবে একটি প্রকৃত প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ।