পুণ্যের মহিমা বনাম ভূমিদস্যুদের গ্রাস: ধ্বংসের মুখে বাংলার ঐতিহাসিক দেবোত্তর সম্পত্তি!
আমাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবময় স্মৃতি আর পবিত্র দেবোত্তর সম্পত্তি আজ ধ্বংসের মুখে! দেবীপুরাণের পবিত্র বাণী স্মরণ করে আসুন, সনাতনী ঐতিহ্য ও জীর্ণ মঠ-মন্দির রক্ষায় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই।
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৪ মে ২০২৬, ০২:১৩
124 জন পড়েছেন
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ক্ষত বাঙালি হিন্দুর জীবনে যে গভীর আঘাত হেনেছিল, তার খতিয়ান আজও স্পষ্ট। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে রাতারাতি জমিদারি প্রথা বিলোপের পেছনে মূল লক্ষ্যই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়কে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, কারণ এখানকার সিংহভাগ জমিদারই ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। মর্যাদা ও প্রাণরক্ষার তাগিদে রাতের অন্ধকারে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যখন তারা ভারতে পাড়ি দিতে বাধ্য হন, তখন পেছনে ফেলে যান রাজকীয় প্রাসাদ আর টেরাকোটা ও নবরত্ন শৈলীতে নির্মিত অনন্য সব দেবালয়। বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী এই মন্দিরগুলো আজ অবহেলা, সাম্প্রদায়িক হিংসা, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং দখলদারিত্বের শিকার হয়ে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যে মণ্ডপগুলোতে একসময় ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হতো, আজ সেখানে কেবলই স্তব্ধতা। আধুনিক ও ব্যস্ত জীবনের যান্ত্রিকতায় আমরা সনাতনীরা আজ এতটাই স্বার্থপর হয়ে পড়েছি যে, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই পবিত্র পুরাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের কান্না শোনার সময় আমাদের নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সোনার তরী' কাব্যের 'পুরষ্কার' কবিতার চরণের মতোই আজ জাগতিক সব বৈভব বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যগুলো কেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, সেই আত্মোপলব্ধি সমাজ হিসেবে আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়নি।
আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, জমিদার বাড়িগুলো সরকারি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দখল হয়ে গেলেও, আমরা দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে এই পবিত্র মন্দিরগুলোকে রক্ষা করতে পারিনি। অথচ একটু সচেতন হলেই জীর্ণ দেবালয়ের পুনঃসংস্কার করে সেখানে নতুন প্রতিমা স্থাপন করা সম্ভব। সনাতন শাস্ত্রের পবিত্র ‘দেবীপুরাণ’-এর ১১৮তম অধ্যায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জীর্ণ মন্দির সংস্কারের অসীম মহিমার কথা বলা হয়েছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, যারা জীর্ণ দেবালয়ের সংস্কার করে নতুন করে দেববিগ্রহ স্থাপন করেন, সেই মহামতিগণ ‘মহাধিয়’ এবং তারা নিষ্পাপ। এমনকি জীর্ণ মন্দিরের সংস্কারকারী ব্যক্তি মূল মন্দির প্রতিষ্ঠাতার চেয়েও শতগুণ বেশি পুণ্য লাভ করেন। এর বিপরীতে, সাধ্য থাকার পরেও যদি আমরা মন্দির সংস্কার না করে দেবালয় শূন্য রাখি, তবে সেখানে দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও নানাবিধ ভীতি নেমে আসে। দেবতারা রুষ্ট হয়ে এমন জীর্ণ ও শূন্য প্রাসাদ পরিত্যাগ করেন এবং সেই পরিত্যক্ত স্থানে অশুভ শক্তির বিস্তার ঘটে, যা মানবসমাজের জন্য মারাত্মক অকল্যাণ ডেকে আনে। শাস্ত্রের এই কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও স্বদিচ্ছা এবং কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় আমরা আজ আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সমাধি, মঠ ও শিবমন্দিরগুলোকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলছি। অনেক স্থানে ভূমিদস্যু ও লোভী মানুষেরা মঠগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, যাতে সেই দেবোত্তর সম্পত্তি গ্রাস করা যায়।
তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জগন্নাথ হলের পুকুরের পশ্চিম পাশে একটি জীর্ণশীর্ণ পরিত্যক্ত মঠ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় আজ তার পূর্বের গৌরব ফিরে পেয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হচ্ছে। কিন্তু টিএসসির সুইমিংপুলের পাশে থাকা অপূর্ব কারুকার্যখচিত দুটি মঠসহ দেশের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা শত শত ঐতিহাসিক মঠ ও মন্দির আজও চরম অবহেলিত। এই দেবোত্তর সম্পত্তিগুলো কেবল সনাতনীদের ধর্মীয় আবেগের অংশ নয়, এগুলো এই ভূখণ্ডের অমূল্য পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ। সনাতনী সমাজের যেমন নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই জীর্ণ মন্দিরগুলোর সংস্কার ও নিয়মিত পূজার ব্যবস্থা করার, তেমনি রাষ্ট্রের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে সংরক্ষণ করার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মূল নীতি অনুযায়ী প্রতিটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। তাই আর বিলম্ব না করে, আমাদের আত্মপরিচয় ও সনাতনী ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল ভগ্ন মঠ-মন্দির পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এখনই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
(তথ্য উপাত্ত:, ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী)