"বিভাজনের সীমানা ক্রমেই দখলে নিচ্ছে মানবতার ভবিষ্যত”
নিজস্ব প্রতিবেদক
হিন্দুস নিউজ
প্রকাশিত:
২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:১৯
308 জন পড়েছেন
বিশ্ব জনসংখ্যার একটি বড় অংশ—প্রায় ১০-২০ %—সংখ্যালঘু হিসেবে বর্ণ, ধর্ম, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিন্নতার কারণে বসবাস করছে বৈষম্য, বঞ্চনা ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে। তাদের অধিকাংশই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ন্যায্য অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়, যা শুধু তাদের জন্যই নয়, পুরো সমাজের জন্যও গভীর সংকট সৃষ্টি করছে।
মহাদেশ পেরিয়ে মহাদেশে এই বৈষম্য ও সহিংসতার ছবিটি বারবার চোখে এসে ধরা দেয়। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে এগিয়ে দেওয়া গণহত্যা, গ্রামে গ্রামে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ২০১৭ সালের তুলা তোলি হত্যাকাণ্ডে প্রায় ৫০০ জনেরও বেশি লোককে হত্যা করা হয়—যাদের মধ্যে অগনিত নারী ও শিশুরা ছিল, জাতিগত ও ধর্মীয় ভেদাভেদের ভিত্তিতে।
অনেক ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের বৈষম্য শুধু সামাজিক আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা আইনের চোখেও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়। সংখ্যালঘু ও Stateless — অর্থাৎ যারা নাগরিকত্ব পায় না তাঁদের ক্ষেত্রে ৭৫ % ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শামিল আছে, যা নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চনা সৃষ্টি করে।
স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলা ও বৈষম্যের সংখ্যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর রিপোর্টে দেখা গেছে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবনতি ও সহিংসতার বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশসহ আমাদের নিজেদের অঞ্চলেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার খবর স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গ্রুপগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। গত বছরে বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতার শতাধিক ঘটনা, মন্দির ও উপাসনালয়ের আক্রমণ, সম্পত্তি ধ্বংস এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন নিয়ে নানাবিধ অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। জাতিসংঘের বিশেষ বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা, গোষ্ঠীভেদ, এবং ভিন্ন মতের প্রতি সহিংস প্রতিক্রিয়া ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে; যেখানে সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণা-ভিত্তিক পোস্ট, ভাষা ও চিন্তার ওপর আক্রমণ আন্তর্জাতিক নজরদারির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংখ্যালঘু-সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভাজন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের শক্তি, আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও মানুষের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজেদের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ধারণাকে ন্যায্যতা দেয়, সেখানে সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার বিপন্ন হয় এবং সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে ওঠে। মানবাধিকার ও সাম্যবাদে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে থাকতে পারে—ব্যক্তিগত ভাবে নয়, সামাজিকভাবে নয়; এইসব রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে শক্তিধর।
আজকের বিশ্বে যদি আমরা বৈষম্যকে প্রশ্রয় দিই, সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধ করি এবং তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিনষ্ট করি—তাহলে এক সময় এমন একটি বিশ্ব তৈরি হবে যেখানে মানবতার অস্তিত্বই বিপন্ন।
আমাদের এখনই ইতিহাস এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে—সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা ও তাদের মৌলিক মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে হবে; আইনকে শক্তিশালী করতে হবে; এবং সমাজকে শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা শুধু তাদের অধিকার নিশ্চিত করে না—এটি আমাদের সমাজের সার্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবেও কাজ করে।
কলমে সুজিত ঘোষ
কলামিষ্ট, লেখক, কবি ও সংগঠক।