পা দিয়ে লিখেই এইচএসসি পরীক্ষা, অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত কলি রানী
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
০২ জুলাই ২০২৬, ১৩:১০
66 জন পড়েছেন
জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। তবু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের শিক্ষার্থী কলি রানী। অন্য পরীক্ষার্থীরা যখন হাতে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, তখন তিনি ডান পা দিয়ে লিখেই নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্র থেকে মানবিক বিভাগে অংশ নেন কলি রানী। পরীক্ষাকক্ষে একটি ছোট বেঞ্চের ওপর খাতা রেখে পা দিয়ে উত্তর লিখতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর এই দৃঢ় মনোবল ও অধ্যবসায় উপস্থিত সবার দৃষ্টি কাড়ে এবং অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
কলি রানীর বাড়ি কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গদাই গ্রামে। তিনি রুপালী রানীর মেয়ে এবং প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ছোটবেলা থেকেই ডান পা দিয়ে লেখা শেখেন। সেই দক্ষতাকেই কাজে লাগিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু এবারের এইচএসসি নয়, এর আগেও শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় এ গ্রেড অর্জনের পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষাতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তাঁর লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেশের মানুষের সেবা করা।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। গান গেয়ে ইতোমধ্যে তিনি একাধিক সম্মাননা ও স্মারক অর্জন করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহারেও তিনি দক্ষ; ডান পা দিয়েই কম্পিউটার ও মুঠোফোন পরিচালনা করতে পারেন।
কলি রানীর ভাষায়, মানুষের প্রকৃত শক্তি শরীরে নয়, ইচ্ছাশক্তিতে। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে চান।
তাঁর বড় ভাই মন্টু রাম রায় জানান, জন্ম থেকেই কলির হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় হাতে কলম ধরা সম্ভব হয়নি। তবে অদম্য আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ডান পা দিয়ে লেখা আয়ত্ত করেন। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য পরীক্ষার্থীর মতোই কলি রানী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিধি অনুযায়ী তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। তাঁর অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য অনুকরণীয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কলি রানীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। উপজেলা প্রশাসন তাঁর উচ্চশিক্ষা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
কলি রানীর জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, দৃঢ় মনোবল, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসই মানুষের সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর এই পথচলা শুধু একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি অসংখ্য মানুষের জন্য সাহস, আশা এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক।