ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নিদারাবাদে এক ভয়াবহ তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। সেসময় তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল উগ্র গ্রামবাসী বিরজাবালা দেবনাথ এবং তাঁর নিষ্পাপ পাঁচ সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তবে এই নির্মমতার সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে, ১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবর। সেদিন শশাঙ্ক দেবনাথ নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ঘাতকরা কেবল তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং শশাঙ্কের দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে সীমান্ত পার করে ভারতের চেহরিয়া গ্রামের একটি পরিত্যক্ত রিফিউজি ক্যাম্পের পাতকুয়ায় ফেলে আসে। পরবর্তীতে দেহাবশেষ উদ্ধার না হওয়ায় ঘাতক চক্র ও তৎকালীন প্রভাবশালী মহল রটিয়ে দেয় যে শশাঙ্ক দেবনাথ ভারতে পালিয়ে গেছেন। একজন নিরপরাধ মানুষকে নিজ দেশে হত্যা করে দেহ অন্য দেশে ফেলে দিয়ে 'ভারতে পালিয়ে যাওয়ার' এমন জঘন্য রটনা তৎকালীন সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘুদের চরম নিরাপত্তাহীনতার কঙ্কালসার চিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে।
বাংলাদেশে সনাতনী ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘুদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে, যা কোনো সুনির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়নি। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ') অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই বিচারহীনতার এই দীর্ঘ সংস্কৃতি লালিত হয়ে আসছে।
অনুরূপ আরেক বিভীষিকাময় ও নৃশংসতম ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের শীলপাড়া গ্রামে। সেদিন মাঝরাতে মধ্যযুগীয় কায়দায় গোটা বাড়িসুদ্ধ আগুন দিয়ে একই পরিবারের ১১ জন নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ৭০ বছর বয়সী তেজেন্দ্র লাল শীল, তাঁর স্ত্রী বকুল শীল (৬০), ছেলে অনিল শীল (৪০), অনিলের স্ত্রী স্মৃতি শীল (৩২), অনিলের তিন শিশুসন্তান রুমি শীল (১২), সোনিয়া শীল (৭) ও মাত্র চারদিন বয়সী অবুঝ শিশু কার্তিক শীল। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেন তেজেন্দ্র শীলের ভাইয়ের মেয়ে বাবুটি শীল (২৫), প্রসাদি শীল (১৭), অ্যানি শীল (৭) এবং কক্সবাজার থেকে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে আসা দেবেন্দ্র শীল (৭২)।
ঐতিহাসিক সেই ভয়াবহতম গণহত্যার পর তেজেন্দ্র লাল শীলের বেঁচে যাওয়া একমাত্র ছেলে বিমল শীল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেসময় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে স্থানীয় বিএনপি নেতা আমিন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। কিন্তু চরম পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত দীর্ঘ ২৩ বছর অতিক্রম হলেও এই নারকীয় ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের আজ পর্যন্ত কোনো সুষ্ঠু ও যথাযথ বিচার সম্পন্ন হয়নি। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও এবং রাষ্ট্র মানবাধিকারের কথা বললেও নিদারাবাদ কিংবা বাঁশখালীর মতো ঘটনার শিকার পরিবারগুলো বিচার মেলেনি আজও। সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরের শিক্ষক হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করার পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মীরা অতীতের এসব বিচারহীন হত্যাকাণ্ডের বিচার চালুরও জোর দাবি জানাচ্ছেন।