ধর্মের জয়, অধর্মের পরাজয়: মানবতার পথপ্রদর্শক শ্রীকৃষ্ণ
মিলন বৈদ্য
সিনিয়র রিপোর্টার
প্রকাশিত:
০১ জুলাই ২০২৬, ১৩:১৫
45 জন পড়েছেন
বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী।
২০২৬ সালে ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করবেন এই পবিত্র তিথি। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা অনুযায়ী, ভগবান প্রায় ৩২২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দ্বাপর যুগে আবির্ভূত হন।
সেই হিসেবে ২০২৬ সালের জন্মাষ্টমীকে প্রায় ৫২৫৪ তম শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরার কারাগারে অত্যাচারী রাজা কংসের বন্দিশালায় দেবকী ও বসুদেবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর জন্মের পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল যে দেবকীর অষ্টম সন্তানই কংসের অত্যাচার ও অন্যায়ের অবসান ঘটাবেন। সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে ভয় পেয়েই কংস একে একে দেবকীর সন্তানদের হত্যা করলেও অষ্টম সন্তান শ্রীকৃষ্ণ অলৌকিকভাবে গোকুলে নন্দ ও যশোদার ঘরে লালিত-পালিত হন।
শৈশব থেকেই শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। তিনি পুতনা, অঘাসুর, বকাসুর, তৃণাবর্তসহ বহু অসুরকে পরাজিত করে মানুষের জীবন থেকে ভয় ও অশান্তি দূর করেন। পরবর্তীতে তিনি অত্যাচারী কংসকে বধ করে মথুরার জনগণকে মুক্তি প্রদান করেন এবং ন্যায় ও সুবিচারের পথ সুগম করেন।
তবে শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় -এর কাহিনিতে। কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে তিনি অস্ত্র ধারণ না করলেও ছিলেন ন্যায় ও ধর্মের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি পাণ্ডবদের বন্ধু, উপদেষ্টা, কূটনীতিক এবং অর্জুনের রথের সারথি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন আত্মীয়-স্বজন, গুরুজন ও আপনজনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্ম, কর্তব্য, আত্মা, ধর্ম ও ন্যায়ের দর্শন সম্পর্কে যে অমর বাণী প্রদান করেন, তা পরবর্তীতে নামে বিশ্বসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
গীতায় শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন—
"যখনই ধর্মের অবক্ষয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই আমি আবির্ভূত হই; সাধুদের রক্ষা, দুষ্টদের বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে আমি অবতার গ্রহণ করি।"
এই বাণী শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং মানবসমাজে ন্যায়, সত্য ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠার এক চিরন্তন অঙ্গীকার।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ মূলত দুই রাজবংশের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না; এটি ছিল ধর্ম ও অধর্ম, সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যকার এক মহাসংগ্রাম। শ্রীকৃষ্ণের দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, কৌশল এবং নৈতিক নেতৃত্বের ফলেই শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের বিজয় এবং কৌরবদের পরাজয় ঘটে। এর মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মের জয় এবং অধর্মের পরাজয়ের চিরন্তন সত্য।
আজকের সমাজেও শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও আদর্শ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, বিভেদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার শিক্ষা দেয় তাঁর জীবনদর্শন।
শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ন্যায়, দায়িত্ব, মানবকল্যাণ ও নৈতিকতার এক অনন্ত আহ্বান। যুগে যুগে, কালে কালে ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও অধর্ম বিনাশের যে চিরন্তন বার্তা শ্রীকৃষ্ণ মানবজাতিকে দিয়ে গেছেন, তা আজও বিশ্বমানবতার জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে।