৫০৮ বছরের ইতিহাস পুনর্জীবিত: অলৌকিক স্বপ্নাদেশ থেকে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হলো মা বুড়া কালীর শ্বেত পাথরের বিগ্রহ
চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাটের ঐতিহাসিক মা বুড়া কালী মন্দিরের অলৌকিক স্বপ্নাদেশ ও দীর্ঘ ১৫ বছরের ঘট পূজার ধারাবাহিকতায় অবশেষে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হলো মায়ের দ্বিতীয় শ্বেত পাথরের বিগ্রহ। ভারতের গয়া থেকে আনা এই অনন্য প্রতিমাটি দীর্ঘ ৫০৮ বছরের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সনাতনীদের ভক্তির এক পরম নিদর্শন হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় আঠারো-উনিশ বছর আগে। চট্টগ্রামের এক পরম সৌভাগ্যবতী মাতা পটিয়ার ধলঘাটের ঐতিহাসিক মা বুড়া কালী মন্দিরে দর্শনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে মায়ের একটি ছবি তাঁর খুব পছন্দ হয় এবং তিনি সেটি সাথে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ছবি নিয়ে আসার মুহূর্তেই অলৌকিকভাবে শূন্য থেকে ভেসে আসে মায়ের দৈববাণী—"তুই যে আমার ছবিটা নিয়ে যাচ্ছিস, আমার নিত্য পূজা করতে পারবি তো?" মায়ের এমন আকস্মিক ও গম্ভীর প্রশ্নে সেই ভক্ত মাতা আবেগাপ্লুত হয়ে উত্তর দেন, "পূজা করার চেষ্টা করবো মা।" তখন জগতজননী মা কালী দয়াপরবশ হয়ে বলেন, "যদি কিছু নাও পারিস, তাহলে প্রতিদিন অন্তত আমায় পান, ফুল ও তেল দিয়ে পূজা করবি।" মায়ের সেই পবিত্র নির্দেশকে শিরোধার্য করে শুরু হয় নিত্য ঘট পূজা। এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে যায় দীর্ঘ ১৫টি বছর। (News copied from- 'হিন্দুস নিউজ')
পনেরো বছর ঘট পূজার পর, মায়ের নিত্য সেবক বিশু ভট্টাচার্যের সাথে পরমারাধ্য মায়ের একটি স্থায়ী বিগ্রহ বানিয়ে বাৎসরিক পূজা শুরু করার বিষয়ে আলোচনা হয়। তখন সেই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ একটি শর্ত দেন যে, বিগ্রহ যদি তৈরি করতেই হয়, তবে তা হুবহু ধলঘাটের আদি বুড়া কালী মায়ের প্রতিরূপ হতে হবে, মায়ের রূপের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করা যাবে না। মায়ের এই অনন্য রূপ ফুটিয়ে তুলতে চট্টগ্রাম শহরের একের পর এক প্রতিমা শিল্পীর দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন সবাই ব্যর্থতা ও হতাশা প্রকাশ করছিলেন, ঠিক তখনই আশার আলো দেখান প্রখ্যাত প্রতিমা শিল্পী শ্রী অমল পাল। তিনি মায়ের রূপ ফুটিয়ে তোলার শতভাগ চেষ্টা করার আশ্বাস দিলে তাঁকে বিগ্রহ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিদিন পরম আগ্রহে মায়ের রূপ তৈরির কাজ পর্যবেক্ষণ করতে যেতেন ভক্তরা।
অবশেষে অধিবাসের দিন যখন মাকে আনতে যাওয়া হলো, তখন উপস্থিত প্রত্যেকেই মায়ের সেই অভূতপূর্ব, অলৌকিক রূপ দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৫০৪ বছর পর চট্টগ্রামে মায়ের এই অনন্য দ্বিতীয় বিগ্রহটি মৃন্ময়ী রূপে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে টানা চার বছর ধরে নিত্য পূজা, অমাবস্যা পূজা ও বাৎসরিক উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছিল।
মৃন্ময়ী রূপ থেকে মাকে চিন্ময়ী ও স্থায়ী রূপে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে পরবর্তীতে ভক্তদের মনে শ্বেত পাথরের প্রতিমা তৈরির ইচ্ছা জাগে। সেই সংকল্প থেকেই ভারতের গয়াতে মায়ের শ্বেত পাথরের এক অপূর্ব প্রতিমা তৈরি করা হয়। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও বর্ডার পার হয়ে প্রায় ছয় মাস আগে মা এসে পৌঁছান সদরঘাটের সেই শিল্পী অমল পালের কারখানায়। যেহেতু তিনিই মায়ের প্রথম রূপ দান করেছিলেন, তাই শ্বেত পাথরের বিগ্রহটিরও শেষ অঙ্গরাগ, ফিনিশিং ও সাজসজ্জা তাঁর নিপুণ হাতেই সম্পন্ন হয়। অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে, দীর্ঘ ৫০৮ বছরের সুপ্রাচীন পরম্পরাকে অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিস্থাপিত হলেন আমাদের পরমেশ্বরী মা বুড়া কালী। মায়ের এই আগমনী বার্তা সনাতনী সম্প্রদায়ের মাঝে এক অভূতপূর্ব আনন্দের জোয়ার বয়ে এনেছে।