দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অনাথ শিশুদের আশ্রয়ে এক মানবসেবকের নাম—স্বামী অখণ্ডানন্দ
হৃদয় চন্দ্র শীল
সুবর্ণচর প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৭
55 জন পড়েছেন
ভারতীয় সমাজসেবার ইতিহাসে স্বামী অখণ্ডানন্দ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি দুর্ভিক্ষ, প্লেগ, কলেরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম সংগঠিত ত্রাণকার্যের পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর অবদান আজও ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
স্বামী অখণ্ডানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম ছিল গঙ্গাধর গঙ্গোপাধ্যায়। ১৮৬৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় তাঁর জন্ম। কৈশোরে দক্ষিণেশ্বরে শ্রী রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসে তিনি তাঁর অন্যতম প্রত্যক্ষ সন্ন্যাসী শিষ্যে পরিণত হন। পরে স্বামী বিবেকানন্দের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করে তিনি সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও দুর্দশার বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের প্রেরণা দেয়।
১৮৯৭ সালে মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের অভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ে। এই সময় কোনো নির্দেশ বা সরকারি সহায়তার অপেক্ষা না করে স্বামী অখণ্ডানন্দ দুর্গত এলাকায় পৌঁছে নিজ উদ্যোগে খাদ্য সংগ্রহ ও বিতরণ শুরু করেন। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগের খবর স্বামী বিবেকানন্দের কাছে পৌঁছালে তিনি অর্থসহায়তার পাশাপাশি আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীকে ত্রাণকার্যে পাঠান।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৯৭ সালের ১৫ মে মুর্শিদাবাদের মহুলা গ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম সংগঠিত ত্রাণকার্য। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল ভারতের অন্যতম প্রথম সুসংগঠিত ধর্মভিত্তিক মানবিক ত্রাণ উদ্যোগ, যা পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ মিশনের ত্রাণ ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
ত্রাণকাজ পরিচালনার সময় স্বামী অখণ্ডানন্দ উপলব্ধি করেন, শুধু খাদ্য বিতরণ করে মানুষের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই দুর্ভিক্ষে পিতামাতা হারানো শিশুদের জন্য তিনি একটি অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। পরে আশ্রমটি মুর্শিদাবাদের সারগাছিতে স্থানান্তরিত হয়। সেখানে বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, কৃষি প্রশিক্ষণ, তাঁতশিল্প, কাঠের কাজ এবং বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষকে ভিক্ষুক নয়, কর্মক্ষম ও স্বনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
গ্রামীণ উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষিকাজে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার, তুলো চাষের প্রসার, কুটিরশিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, স্বনির্ভর গ্রামই দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৮৯৮ সালে কলকাতায় প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়লে শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আক্রান্তদের কাছেও যেতে যখন অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন, তখন স্বামী অখণ্ডানন্দ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জীবাণুনাশক ছিটানো এবং জনসচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করেন। প্লেগের টিকা নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করতে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রচারপত্র প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
কলেরা, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও তিনি একইভাবে সক্রিয় ছিলেন। খাদ্য ও ওষুধ বিতরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং রোগ প্রতিরোধের ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে তিনি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও স্বামী অখণ্ডানন্দ ছিলেন ব্যতিক্রমী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রমে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের শিশুরা সমান সুযোগে শিক্ষা ও আশ্রয় পেত। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা ভোগ করত। এমনকি স্থানীয় মুসলিম জমিদার হাজি মহরম আলী আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিলেন, যা সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৩৪ সালে স্বামী অখণ্ডানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের তৃতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি সারগাছির আশ্রমে শিক্ষা, কৃষি, অনাথ শিশুদের লালন-পালন এবং গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৩৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মানবসেবার আদর্শ আজও রামকৃষ্ণ মিশনের ত্রাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে অনুসৃত হচ্ছে।
দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে মহামারির সময় জনস্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলা, অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেওয়া এবং স্বনির্ভর সমাজ গঠনের যে আদর্শ স্বামী অখণ্ডানন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও মানবসেবার ক্ষেত্রে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।