রাঙ্গুনিয়ায় ভক্তিময় পরিবেশে ঝুলনযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি
সৌরভ সাহা
রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১১
37 জন পড়েছেন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও ভক্তিময় ধর্মীয় উৎসব ঝুলনযাত্রা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি ও আনন্দঘন পরিবেশে পালনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে।
গত ২৩ আগস্ট ২০২৬, রবিবার থেকে উপজেলার দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সমভাব আদিত্য ধাম ও রাধাগোপীনাথ মন্দির প্রাঙ্গণে ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে শুরু হয় কয়েকদিনব্যাপী বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন। নানা পূজা-অর্চনা, আরতি, নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে আজ ২৮ আগস্ট, শুক্রবার এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
রাধা-কৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমলীলা ও বৃন্দাবনের আনন্দময় লীলাকে স্মরণ করে সনাতন রীতি ও বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় এ উৎসব পালন করা হয়। ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণকে সাজানো হয় নান্দনিকভাবে। রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ সুসজ্জিত দোলনায় স্থাপন করে ভক্তিমূলক বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
উৎসবের শুরু থেকেই প্রতিদিন মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত সময়ে পূজা-অর্চনা ও আরতি শেষে ভক্তদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তন। হরিনাম সংকীর্তনের সুমধুর ধ্বনি ও ভক্তিগানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ভক্তরাও এ ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেন। নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন বয়সী ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবস্থলে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেক ভক্ত রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ দর্শন করে পূজা ও প্রার্থনায় অংশ নেন এবং নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করেন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঝুলনযাত্রা রাধা-কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা ও তাঁদের চিরন্তন প্রেমের স্মরণে পালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণবীয় উৎসব। দোলনায় রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ স্থাপন করে দোলানোর মাধ্যমে ভক্তরা তাঁদের লীলাকে স্মরণ করেন। ভক্তদের কাছে এ আয়োজন প্রেম, ভক্তি, আনন্দ ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য মিলনস্থল।
ঝুলনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃন্দাবনের সেই আনন্দময় লীলার স্মৃতি। বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে আত্মিক প্রেম ও ভক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই এ উৎসবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ভক্তরা ঈশ্বরের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
উৎসব চলাকালে মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভক্তিমূলক গান ও কীর্তনের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনে অংশ নিয়ে ভক্তরা ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশ করেন এবং পরস্পরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
আজ শুক্রবার ছিল ঝুলনযাত্রা উৎসবের শেষ দিন। শেষ দিনের বিশেষ আয়োজনে পূজা-অর্চনা, আরতি, নামসংকীর্তন, ভজন ও কীর্তনের মধ্য দিয়ে রাধা-কৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা। এ সময় মন্দির প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক গভীর ভক্তিময় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
উৎসবের সমাপ্তি উপলক্ষে ভক্তদের মাঝে ছিল আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন অনুভূতিও। কয়েকদিন ধরে চলা ধর্মীয় আয়োজন শেষে ভক্তরা একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং রাধা-কৃষ্ণের আশীর্বাদ কামনা করেন।
আয়োজকদের মতে, ঝুলনযাত্রার মতো ধর্মীয় আয়োজন শুধু পূজা-পার্বণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্য, বৈষ্ণবীয় সংস্কৃতি ও ভক্তিমূলক চর্চা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁরা আরও বলেন, ধর্মীয় উৎসব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। ঝুলনযাত্রার মূল চেতনা—প্রেম, ভক্তি, শান্তি ও মানবিকতার বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সবশেষে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি ও আনন্দের আবহে দক্ষিণ সাবেক রাঙ্গুনিয়ার সমভাব আদিত্য ধাম ও রাধাগোপীনাথ মন্দিরে কয়েকদিনব্যাপী ঝুলনযাত্রা উৎসবের সমাপ্তি হয়। উৎসব শেষ হলেও রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ও ভক্তির সেই আবেশ ভক্তদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।