উপমহাদেশের সুরের রানি শ্রেয়া ঘোষাল, যার শেকড় মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে
জয় দাশ
রাউজান প্রতিনিধি
প্রকাশিত:
২৯ জুন ২০২৬, ০৯:১২
205 জন পড়েছেন
ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতজগতের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল। বলিউড থেকে শুরু করে বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, মারাঠি, গুজরাটি ও কন্নড়সহ বিভিন্ন ভাষার গানে নিজের অনন্য কণ্ঠে কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয় জয় করেছেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর পারিবারিক শেকড় যে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক বিক্রমপুর অঞ্চলে, সে তথ্য অনেকেরই অজানা।
শ্রেয়া ঘোষালের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার হাসাড়া গ্রামে। দেশভাগের আগে তার পরিবার সেখানেই বসবাস করত। পরে তার দাদা সুধীরচন্দ্র ঘোষাল কলকাতায় চলে গেলেও বিক্রমপুরের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ও স্মৃতি আজও অটুট রয়েছে।
শৈশব থেকেই দাদার মুখে বাংলাদেশের গল্প শুনে বড় হয়েছেন শ্রেয়া। বহুদিন ধরে নিজের শেকড়ের সেই মাটিতে যাওয়ার ইচ্ছা লালন করছিলেন তিনি। অবশেষে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষালকে সঙ্গে নিয়ে মুন্সিগঞ্জের হাসাড়া গ্রামে যান। সেখানে তিনি পূর্বপুরুষের ভিটা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটান।
সফর শেষে আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করে শ্রেয়া বলেছিলেন, "ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, দাদুর বাড়ি ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু কোনো দিন দেখিনি। এবার বাংলাদেশে এসে সুযোগ পেলাম, তাই দাদার বাড়ি দেখতে চলে গেলাম।"
হাসাড়া গ্রামের সবুজ প্রকৃতি, মানুষের আন্তরিকতা এবং বিক্রমপুরের ঐতিহ্য তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। স্থানীয় দোকানের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাওয়ার পাশাপাশি ডাবের পানিও পান করেন তিনি। পূর্বপুরুষের ভিটায় দাঁড়িয়ে তিনি আরও বলেন, "এখন সেখানে আমাদের খুব কাছের কেউ নেই, শুধু স্মৃতিটুকুই সম্বল। কিন্তু তারপরও মনে হচ্ছিল, এটাই আমার শেকড়। আমার জন্ম তো এখানেও হতে পারত।"
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রেয়া ঘোষালের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে হাসাড়া স্কুলেরও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তার পূর্বপুরুষ শিক্ষক ইন্দ্রমোহন ঘোষাল একসময় ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। ফলে শুধু একটি বাড়িই নয়, পুরো হাসাড়া গ্রামজুড়েই ছড়িয়ে আছে ঘোষাল পরিবারের স্মৃতি।
১৯৮৪ সালের ১২ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রেয়া ঘোষাল। মাত্র চার বছর বয়সে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন এবং পরে শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষণ নেন। ২০০০ সালে একটি সংগীত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় লীলা বানসালির হাত ধরে 'দেবদাস' চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করার সুযোগ পান। সেই চলচ্চিত্রের গানই তাকে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত করে।
পরবর্তী সময়ে "জাদু হ্যায় নাশা হ্যায়", "বরসো রে", "তেরে মাস্ত মাস্ত দো নয়ন", "দেওয়ানি মাস্তানি"সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের অন্যতম সফল প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার ঝুলিতে রয়েছে একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা।
শ্রেয়া ঘোষাল পেশাগত কারণেই শুধু নয়, আবেগের জায়গা থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করেন। ঢাকায় আয়োজিত বিভিন্ন কনসার্টে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। বিক্রমপুর সফরের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, "শেকড়ের টান বড় অদ্ভুত। এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে গান গাইতে খুব ভালো লাগে।"
আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত শ্রেয়া ঘোষালের সাফল্যের আড়ালেও রয়ে গেছে বিক্রমপুরের মাটির গন্ধ, হাসাড়া গ্রামের স্মৃতি এবং পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া এক আবেগময় ইতিহাস। বাংলাদেশের সঙ্গে এই অদৃশ্য বন্ধনই তার জীবনের এক অনন্য পরিচয় হয়ে রয়েছে।